| বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে রাষ্ট্রীয় গুলিতে রক্তস্নান, শহীদ ৫২ জন

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 05-08-2025 ইং
  • 4548449 বার পঠিত
৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে রাষ্ট্রীয় গুলিতে রক্তস্নান, শহীদ ৫২ জন
ছবির ক্যাপশন: ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে রাষ্ট্রীয় গুলিতে রক্তস্নান

৫ আগস্ট: যাত্রাবাড়ীতে রক্তস্নান—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নির্মম চিত্র

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশকাল: ৫ আগস্ট ২০২৫
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন ডেস্ক

যে দিনে রাজধানী ঢাকায় জ্বলে উঠেছিল ছাত্র-জনতার ক্রোধ, আর পুলিশের গুলিতে ঝরেছিল শত শত প্রাণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি ভয়াবহ দিন। ঠিক বিকেল ৫টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ সড়কে যখন দিনের আলো কমতে শুরু করেছিল, তখনই রক্তে রঞ্জিত হয় শহরের রাজপথ। পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে এক তরুণ শ্রমিক, ১৮ বছরের মো. মেহেদী।

মেহেদী কুতুবখালীর একটি হেজবোল্ট কারখানায় কাজ করতেন। কর্মস্থল থেকে বের হয়ে আন্দোলনের খবর শুনে পরিস্থিতি দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে তার গন্তব্য হয় মৃত্যু। একজন পুলিশ সদস্য সরাসরি তার উপর রাইফেল তাক করে গুলি করেন—রাস্তা রক্তে ভেসে যায়।

এই একটি মৃত্যুই নয়, সেদিন যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত সাধারণ মানুষ—এদের অনেকেই ছিলেন আন্দোলনকারী, কেউবা সাধারণ পথচারী।

একটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: দাবি ছিল একটাই—শাসন বদলাও

গত বছরের ৩ আগস্ট ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেতারা ঘোষণা দেন,

“সরকার পতন ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”

এই এক দফা ঘোষণার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় শক্তি হয়ে ওঠে আগ্রাসী।
বিশেষ করে ৪ ও ৫ আগস্ট ছিল যেন এক দমন-পীড়নের প্রতিযোগিতা। যাত্রাবাড়ী, কুতুবখালী, শনিরআখড়া, কাজলা—সব এলাকার গলিতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

সংখ্যায় বিভীষিকা: ঢাকাতেই ৪২৬ শহীদ, যাত্রাবাড়ীতে অন্তত ১১৭

বিভিন্ন স্থানীয় সূত্র এবং মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে:

  • ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শুধুমাত্র রাজধানীতে ৪২৬ জন শহীদ হন।

  • এর মধ্যে শুধু ৫ আগস্টেই যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হন ৫২ জন

  • পুরো যাত্রাবাড়ী অঞ্চলে শহীদ হন কমপক্ষে ১১৭ জন

এই সংখ্যাগুলো নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রীয় গুলির সর্বনাশা ইতিহাস তুলে ধরে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৩ শাপলা চত্বর কিংবা ২০০১ সালের অপারেশন ক্লিনহার্টের বর্বরতাকেও ছাপিয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে বিভীষিকার দিনগুলো

🔹 শাহাদত হোসেন (কুতুবখালীর বাসিন্দা):

“৫ আগস্ট বিকেল ৩টায় ছাদে উঠে চারপাশে গুলির শব্দ শুনি। দেখি তিনজন যুবক কাতরাচ্ছে। আন্দোলনের গতি বাড়ে আবু সাঈদের শাহাদতের পর।”

🔹 শহীদুল আলম (কাজলার বাসিন্দা):

“১ আগস্ট থেকেই যাত্রাবাড়ীতে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়। মোড়ে মোড়ে সংঘর্ষ হচ্ছিল। পুলিশের গুলির শব্দ যেন বৃষ্টির মতো পড়ছিল।”

🔹 খোকন চন্দ্র বর্মণ (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদানকারী):

“১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে একজনের বুক চিরে গুলি বের হয়ে যেতে দেখি। সেদিনের মতো বিভৎস মৃত্যু আর দেখিনি।”

🔹 শিমুল আহমেদ (সরকারি বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী):

“মিরপুর ১০ নম্বরে ৪ আগস্ট সকাল থেকেই রণক্ষেত্র। ৫ আগস্ট আমরা জীবন বাজি রেখে এক দফার জন্য লড়াই চালিয়ে গেছি।”

১৯৫২–২০২৫: রাষ্ট্রীয় গুলিতে রক্তের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসে রক্ত আছে—কিন্তু বারবার সেই রক্ত ঝরেছে নিজেদেরই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে।

  • ১৯৫২: ভাষার জন্য গুলি, সালাম-রফিক-জব্বার শহীদ।

  • ১৯৮৩: শিক্ষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ জয়নাল।

  • ২০১৩: শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে গুলি—অজস্র মৃত্যু।

  • ২০১৮: নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কিশোরদের ওপর চরম দমন।

  • ২০২৪: যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুরে গুলির বৃষ্টি—শত শত লাশ।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বারবার নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই গুলি করে হত্যা করেছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া

২০২৪ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে বলে:

“বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে সংঘটিত এই গণহত্যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।”

এছাড়া, জাতিসংঘ মহাসচিবও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানান।

উপসংহার: যে রক্ত নদী বয়ে গেছে যাত্রাবাড়ীতে, তার হিসাব হবে কোথায়?

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, শহীদের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণহত্যার দিন।

যে তরুণটি কারখানা থেকে বেরিয়ে শুধু দেখতেই গিয়েছিল কী হচ্ছে—সে মেহেদী, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্র তাকে ছেড়ে দেয়নি।

এই রাষ্ট্রকে বদলাতে হলে, এই রক্তস্নানকে ভুলে গেলে চলবে না।


সূত্র:

  1. প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার – যাত্রাবাড়ী, আগস্ট ২০২৫

  2. সাক্ষ্য – খোকন চন্দ্র বর্মণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

  3. Human Rights Watch রিপোর্ট – আগস্ট ২০২৪

  4. বাংলাদেশ ইতিহাস গবেষণা সংস্থা, “রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধারাবাহিকতা”, ২০২৫

  5. যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন – নিউজ আর্কাইভ ২০২৪

    প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
    আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency