প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা একটি দলের প্রধানই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব ও আধুনিক রাজনৈতিক ফ্যাশনের আইকন। পরনে সুনিপুণ শিফন শাড়ি, নিখুঁতভাবে আঁকা ভ্রু এবং চোখে বড় সানগ্লাস—জনপরিসরে তার এই অবয়বটি ছিল আভিজাত্য ও দৃঢ়তার সংমিশ্রণ। ২০২৬ সালের এই নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখা যায় তিনি কীভাবে একটি রক্ষণশীল সমাজের প্রথা ভেঙে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
বাঙালি নারীর সাজপোশাক ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিবর্তনটি অত্যন্ত দীর্ঘ। ১৯০০ সালের শুরুর দিকে মুসলিম সমাজে নারীরা ছিলেন মূলত অন্দরমহলবন্দি। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব পর্যন্ত সময়ে বেগম রোকেয়ার মতো অগ্রজরা শিক্ষার আলোকবর্তিকা নিয়ে লড়াই করেছেন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্বের শীর্ষে তাদের উপস্থিতি ছিল বিরল।
১৯৭১ ও পরবর্তী রাজনীতি: স্বাধীনতার পর ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন এবং ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর রাজনীতিতে আসেন গৃহবধূ খালেদা জিয়া। শুরুতে সাদা সুতি শাড়ি ও আধোঘোমটায় তার যে ‘বিধবার রূপ’ দেখা গিয়েছিল, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা এক অপরাজেয় নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীত্ব ও শৈলী পরিবর্তন: ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার সাজপোশাকে আসে মার্জিত আধুনিকতা। একরঙা সিল্ক, জর্জেট বা শিফন শাড়ির সাথে মিলানো শাল এবং সামনের দিকে ফুলিয়ে বাঁধা চুলের স্টাইলটি 'আইকনিক' হয়ে ওঠে।
২০২৪-২৬: বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর এবং খালেদা জিয়ার প্রয়াণ পরবর্তী ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে তার সেই ব্যক্তিত্বকে বিশ্লেষকরা দেখছেন 'পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এক শক্তিশালী নারীত্বের প্রমাণ' হিসেবে।
অধ্যাপক নাহরিন আই খান ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া মুসলিম প্রধান দেশে প্রধানমন্ত্রী হয়েও কখনও কৃত্রিম ধর্মীয় লেবাস বা কট্টরবাদী পোশাক গ্রহণ করেননি। নির্বাচনের আগেও তাকে তসবিহ হাতে বা হিজাব পরে ভোটের রাজনীতি করতে দেখা যায়নি। তার এই স্বচ্ছ ও স্থির ব্যক্তিত্বই তাকে জামায়াতে ইসলামীর মতো ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। নারী নেতৃত্ব নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তারা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের অধীনে জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার নান্দনিক সাজপোশাক যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের রোষানলের শিকারও হয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে খোদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার ভ্রু আঁকা বা সাজগোজ নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন। তবে খালেদা জিয়া কোনোদিন এসব ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব দেননি। তিনি তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, আভিজাত্য ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
১৯৯৩ (দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস): "বাংলাদেশ একটি সহনশীল ইসলামী দেশ, যেখানে নারীরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে।"
সংগীতশিল্পী পুতুল (২০২৪/২৫): "রাষ্ট্রপ্রধান হতে হলে বোধ হয় এতটাই আভিজাত্য নিজের ভেতর ধারণ করতে হয়।"
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ: "তিনি কট্টরবাদী লেবাসে যাননি, বরং জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে ৪৪ বছর দল পরিচালনা করেছেন।"
২০২৬-এর প্রেক্ষাপট: বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার সেই 'এলিগেন্ট' ইমেজটি তরুণ নারী রাজনীতিকদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
১৯০০ সাল থেকে যে বাঙালি নারী সমাজ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল, খালেদা জিয়া সেই মুক্তির এক ভিন্ন ধারার প্রতিনিধি। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিক ও ফ্যাশনেবল থেকেও এদেশের মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘ চার দশক রাজত্ব করা সম্ভব। তিনি কোনো নির্বাচনে হারেননি, যা তার জনপ্রিয়তার এক অবিসংবাদিত প্রমাণ। ২০২৬ সালের এই সময়েও তার সেই শিফন শাড়ি আর সানগ্লাসের আভিজাত্যময় ছবিটি বাংলাদেশের রাজনীতির চিরস্থায়ী আল্পনা হয়ে থাকবে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (১৯৯৩), 'খালেদা'—মহিউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, যুগান্তর এবং বিডিএস ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সির আর্কাইভ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |