| বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ সুদান মিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নতুন কন্টিনজেন্ট: শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের তিন দশকের গৌরবগাথা

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 09-12-2025 ইং
  • 2258801 বার পঠিত
দক্ষিণ সুদান মিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নতুন কন্টিনজেন্ট: শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের তিন দশকের গৌরবগাথা
ছবির ক্যাপশন: বাংলাদেশ নৌবাহিনী

বিশ্বশান্তির দূতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী: দক্ষিণ সুদান মিশনে নতুন কন্টিনজেন্ট, সুদীর্ঘ ইতিহাসের গর্বিত ধারা

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

জাতিসংঘের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের গৌরবময় অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ‘ইউনাইটেড নেশন্স মিশন ইন সাউথ সুদান (আনমিস)’-এ নিয়োজিত হলো ‘বাংলাদেশ ফোর্স মেরিন ইউনিট-১১’। প্রথম গ্রুপে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৯৯ জন চৌকস সদস্যের একটি কন্টিনজেন্ট মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) ঢাকা ত্যাগ করেছে।

এই কন্টিনজেন্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ সুদানের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। তারা সেখানে এর পূর্বসূরি ‘বাংলাদেশ ফোর্স মেরিন ইউনিট-১০’ এর প্রতিস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয় গ্রুপে আরও ৩৯ জন নৌ-সদস্য আগামী ১৯ ডিসেম্বর শান্তিরক্ষী মিশনে যোগদান করবেন বলে জানানো হয়েছে।

শান্তিরক্ষায় নৌবাহিনীর বিশেষ দায়িত্ব ও অবদান

দক্ষিণ সুদানে নিয়োজিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফোর্স মেরিন ইউনিট জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন রক্ষাকারী দায়িত্বগুলো পালন করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিতকরণ: সুদানের প্রত্যন্ত এলাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, খাদ্য সামগ্রী, ওষুধপত্র ও মানবিক সাহায্য বহনকারী বার্জগুলোর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা বিধান করা।

  • জলদস্যুতা নিয়ন্ত্রণ: নৌপথের জলদস্যুতা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে শান্তি বজায় রাখা।

  • মানবিক সহায়তা: অগ্নিনির্বাপণে স্থানীয় জনগণকে সহায়তা প্রদান করা।

  • নিরাপত্তা ও উদ্ধার: বার্জগুলোতে কর্মরত বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করা।

  • রসদ পরিবহন: মিশনে নিয়োজিত সদস্যদের প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রী দুর্গম স্থানে পরিবহণে নিয়মিত কাজ করা।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এর আগে নৌবাহিনীর ফোর্স মেরিন ইউনিট নীল নদের দীর্ঘ ১৩১১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মোট ৭১টি লজিস্টিক অপারেশন্স (অপারেশন লাইফ লাইন) সফলভাবে সম্পন্ন করেছে, যা সুদান মিশনে বাংলাদেশের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


🇧🇩 ১৯৫০ থেকে ২০২৫: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্থান

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই আন্তর্জাতিক সাফল্য দেশের সুদীর্ঘ পথচলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৫০ সাল থেকে বর্তমান ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বশান্তি রক্ষায় অংশগ্রহণ এক গৌরবময় অধ্যায়।

সময়কালপ্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক/সামরিক ঘটনাবক্তব্য ও প্রেক্ষাপট
১৯৫০-১৯৭১স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের ভিত নড়ে যায়। এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ (১৯৭১): "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম" – যা সামরিক প্রস্তুতি ও জাতি গঠনের চূড়ান্ত নির্দেশনা দেয়।
১৯৭২-১৯৮৮স্বাধীনতার পর জাতি গঠন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি নির্ধারিত হয়: "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়"। এর ভিত্তিতেই পরবর্তীতে বিশ্বশান্তি মিশনে অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়।
১৯৮৮ (প্রথম অংশগ্রহণ)জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের পদার্পণ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ (UNIIMOG)-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পদার্পণ করে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
২০০০ সাল থেকেশান্তিরক্ষায় নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠাএই সময়কালে নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী বিভিন্ন মিশনে (যেমন সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, আইভরি কোস্ট) সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করে। নৌবাহিনী এই সময়েই সমুদ্রসীমা রক্ষায় এবং মেরিটাইম টাস্কফোর্সে অংশগ্রহণে সক্ষমতা দেখায়।
২০১০ সাল থেকেনৌবাহিনীর বিশেষায়িত অংশগ্রহণএই দশকে মেরিটাইম নিরাপত্তা ও নৌ-ভিত্তিক শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ে। লেবাননের ভূমধ্যসাগরে জাতিসংঘের মেরিটাইম টাস্কফোর্সে (UNIFIL-MTF) উপমহাদেশের মধ্যে একমাত্র সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বানৌজা সংগ্রাম’ নিয়োজিত রয়েছে। এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নৌ সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক আস্থা বৃদ্ধির প্রমাণ।
২০২২-২০২৫আধুনিকায়ন ও বিশেষায়িত ভূমিকাবাংলাদেশ সরকার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছে। নৌবাহিনীর নতুন কন্টিনজেন্ট প্রেরণের এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে (যেমন দক্ষিণ সুদান) বিশেষায়িত লজিস্টিক ও উদ্ধার তৎপরতায় বাংলাদেশ একটি নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিশ্ব কর্তৃক স্বীকৃত।

বিশ্লেষণ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণ শুধু একটি সামরিক দায়িত্ব পালন নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও সামরিক ভাবমূর্তির এক শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নৌবাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে অত্যন্ত আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আহত সামরিক-অসামরিক ব্যক্তিদের উদ্ধার, জরুরি চিকিৎসা সেবা এবং ডুবুরি সহায়তা প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় তারা সফল।

দক্ষিণ সুদানে 'অপারেশন লাইফ লাইন' সফলভাবে সম্পন্ন করা বা লেবাননে মেরিটাইম টাস্কফোর্সে অংশগ্রহণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ তার পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিয়েছে। এই গর্বিত অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে এবং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় জাতির পিতার পররাষ্ট্র নীতির প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।


সূত্র

১. আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)-এর বিজ্ঞপ্তি।

২. গুগল সার্চ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতিহাস ও শান্তিরক্ষা মিশন সংক্রান্ত তথ্য।

৩. বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অফিসিয়াল তথ্য।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency