| বঙ্গাব্দ

বাগেরহাট ৪ আসন পুনর্বহাল: ইসির গেজেট অবৈধ ঘোষণা বহাল রাখলো সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 10-12-2025 ইং
  • 2240135 বার পঠিত
বাগেরহাট ৪ আসন পুনর্বহাল: ইসির গেজেট অবৈধ ঘোষণা বহাল রাখলো সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ
ছবির ক্যাপশন: সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগ

ঐতিহাসিক রায়: বাগেরহাটে চার আসন পুনর্বহাল, ইসির গেজেট অবৈধ ঘোষণা বহাল রাখলো আপিল বিভাগ (১৯৬৯-২০২৫)

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

হাইকোর্টের রায় বহাল: বাগেরহাটে কমছে না সংসদীয় আসন

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত গেজেটকে অবৈধ ঘোষণার মাধ্যমে বাগেরহাটের সংসদীয় আসন সংখ্যা চারটি বহাল রাখলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাগেরহাটে চারটি আসন থেকে কমিয়ে তিনটি আসন করার যে উদ্যোগ নির্বাচন কমিশন নিয়েছিল, তা চূড়ান্তভাবে বাতিল হলো।

বুধবার (১০ ডিসেম্বর, ২০২৫) প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের করা লিভ টু আপিলটি খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে, রিটকারীদের আইনজীবি ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই রায়ের ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে বাগেরহাটে চারটি আসন পুনর্বহাল করে অবিলম্বে গেজেট জারি করতে হবে। একই সঙ্গে, এই রায়ের প্রভাবে গাজীপুরেও আগের মতো ৫টি সংসদীয় আসন বহাল থাকবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

আদালতে এদিন রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন ও অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী।

১৯৬৯ থেকে ২০২৫: ঐতিহাসিক ৪ আসনের ধারাবাহিকতা

বাগেরহাটের ৪টি সংসদীয় আসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৬৯ সাল থেকে এই ৪টি আসনই বহাল ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সকল জাতীয় নির্বাচনেই এই কাঠামো অনুসরণ করা হয়েছে। আসনগুলোর বিন্যাস ছিল নিম্নরূপ:

  • বাগেরহাট-১: চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট উপজেলা।

  • বাগেরহাট-২: বাগেরহাট সদর ও কচুয়া উপজেলা।

  • বাগেরহাট-৩: রামপাল ও মোংলা উপজেলা।

  • বাগেরহাট-৪: মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলা।

দীর্ঘ এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩০ জুলাই (২০২৫) নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে বাগেরহাটের আসন সংখ্যা ৪টি থেকে কমিয়ে ৩টি করার একটি প্রস্তাবনা দেয়।

রাজনৈতিক আন্দোলন ও জনমানুষের দাবি উপেক্ষার অভিযোগ

নির্বাচন কমিশনের এই প্রাথমিক প্রস্তাবনা প্রকাশিত হওয়ার পরপরই স্থানীয় রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল একজোট হয়ে ‘সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটি আসন কমানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হরতাল, অবরোধ, অবস্থান, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন শুরু করে। এমনকি কমিশনের শুনানিতেও অংশ নিয়ে তারা ৪টি আসন বহাল রাখার পক্ষে জোরালো দাবি জানান।

২০০০-পরবর্তী রাজনীতি ও আসন পুনর্বিন্যাস:

২০০৮ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হলেও বাগেরহাটের ক্ষেত্রে ৪ আসনের কাঠামো সাধারণত অপরিবর্তিত রাখা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের এই প্রস্তাবটি জনগণের সেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবি ও ঐতিহাসিক বিন্যাসকে আঘাত করে।

তবে, গণমানুষের দাবি উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন গত ৪ সেপ্টেম্বর (২০২৫) আসন কমানোর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে। ওই গেজেটে বাগেরহাটকে ৩টি আসনে ভাগ করা হয় এবং সীমানায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। নতুন বিন্যাসটি ছিল:

  • বাগেরহাট-১: বাগেরহাট সদর, চিতলমারী ও মোল্লাহাট।

  • বাগেরহাট-২: ফকিরহাট, রামপাল ও মোংলা।

  • বাগেরহাট-৩: কচুয়া, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা।

সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি ইসির এই গেজেটকে 'গণমানুষের দাবিকে উপেক্ষা করার চূড়ান্ত নজির' হিসেবে অভিহিত করে এবং আন্দোলন আরও জোরদার করে।

আইনি লড়াই: রিট, রুল ও হাইকোর্টের রায়

নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর বাগেরহাটের ৪টি আসন বহাল রাখার দাবিতে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট দায়ের করা হয়। রিট দায়েরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল বাগেরহাট প্রেসক্লাব, জেলা আইনজীবী সমিতি, জেলা বিএনপি, জেলা জামায়াতে ইসলামী, জেলা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জেলা ট্রাক মালিক সমিতি। এই রিটগুলোতে বাংলাদেশ সরকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন সচিব ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিবাদী করা হয়।

আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায়:

  • ১৬ সেপ্টেম্বর (২০২৫): হাইকোর্ট রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি করেন। রুলে বাগেরহাটের ৪টি সংসদীয় আসন বহাল করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং নির্বাচন কমিশনের গেজেট কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

  • ১০ নভেম্বর (২০২৫): হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের গেজেটটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং একইসঙ্গে বাগেরহাটের ৪টি সংসদীয় আসন বহাল রাখার নির্দেশ দেন।

  • ৩ ডিসেম্বর (২০২৫): হাইকোর্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করেন এবং নির্বাচন কমিশনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাগেরহাটের ৪টি আসন পুনর্বহাল করে গেজেট জারির নির্দেশ দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করে। বুধবার আপিল বিভাগ সেই লিভ টু আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলেন।

বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট: রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ১৯৯০-পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকেই সীমানা নির্ধারণ একটি সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর (যা ২০১১ সালের দিকে চূড়ান্ত হয়), নির্বাচনকালীন সময়ে ইসির ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বেড়েছে। বাগেরহাটের ৪ আসন কমিয়ে ৩ আসন করার প্রচেষ্টাটি স্থানীয় ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। আপিল বিভাগের আজকের রায়টি সেই ১৯৬৯ সাল থেকে চলে আসা ঐতিহাসিক সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের কাঠামোকে বৈধতা দিল এবং স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দাবি ও আন্দোলনের প্রতি আদালত তার সম্মান প্রদর্শন করলো। এটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গণদাবিকে উপেক্ষা করার প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত তৈরি করলো।


সূত্র

  • যুগান্তর পত্রিকার প্রাথমিক প্রতিবেদন।

  • সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের প্রকাশিত রায়ের কপি ও কোর্টরুম শুনানি পর্যবেক্ষণ।

  • রিটকারী আইনজীবীদের প্রেস ব্রিফিং।

  • বাগেরহাটের সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির আন্দোলন সংক্রান্ত নথি।

  • নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত গেজেট ও প্রস্তাবনা।

  • বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংসদীয় নির্বাচন সম্পর্কিত সরকারি তথ্য।


বিশ্লেষণ প্রতিবেদন কারির নাম

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency