| বঙ্গাব্দ

কেন আত্মসমর্পণ করবে না আইআরজিসি? খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন রণকৌশল।

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 05-04-2026 ইং
  • 306265 বার পঠিত
কেন আত্মসমর্পণ করবে না আইআরজিসি? খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের নতুন রণকৌশল।
ছবির ক্যাপশন: আইআরজিসি

আইআরজিসি: একটি সেনাবাহিনী নয়, বরং এক ‘অজেয় আদর্শ’—কেন তারা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়বে?

বিশেষ সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও মিডল-ইস্ট এনালিস্ট)

তেহরান/ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে গত এক মাস ছিল রক্তক্ষয়ী। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল ইরান হয়তো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অস্ত্র সমর্পণের’ আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রমাণ করেছে যে, তারা কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়—তারা একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরে এক অদম্য রাষ্ট্র।

১. ইতিহাসের শিক্ষা: মিলিশিয়া থেকে বিশ্বস্ত রক্ষক

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর রাজতন্ত্রের অবশেষ মুছে দিতে যে ছাত্র মিলিশিয়া গঠিত হয়েছিল, আজ তা ১ লাখ ৯০ হাজার নিয়মিত সদস্য এবং সাড়ে ৪ লাখ ‘বাসিজ’ রিজার্ভ ফোর্সের এক বিশাল দানবীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

  • আর্তেশ বনাম পাসদারান: শাহের আমলের প্রথাগত সেনাবাহিনী ‘আর্তেশ’-এর পাল্টা অভ্যুত্থান রুখতে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী দ্রুতই সর্বোচ্চ নেতার একনিষ্ঠ ‘পাসদারান-এ ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের রক্ষকে পরিণত হয়। ১৯৮০-র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রের মুখে তাদের লড়াই করার অভিজ্ঞতা আজ মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের মুখেও তাদের অবিচল রেখেছে।

২. ছায়াবাহিনী ও ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ (War of Attrition)

আইআরজিসি-র সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং তাদের তৈরি করা ‘প্রক্সি’ বা ছায়াবাহিনী।

  • কুদস ফোর্স: ১৯৮২ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর জন্ম দিয়ে যে কুদস ফোর্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তারা গত ৪ দশকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে নাস্তানাবুদ করেছে। ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি পলায়ন এবং ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন প্রস্থান—সবই ছিল আইআরজিসি-র ‘আইইডি’ (IED) ও গেরিলা কৌশলের ফসল।

  • বর্তমান কৌশল: মার্কিন স্থল বাহিনী যদি ইরানে প্রবেশ করে, তবে আইআরজিসি কোনো সম্মুখ যুদ্ধে যাবে না। তারা ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ শুরু করবে, যেখানে প্রতিটি পাহাড় আর অলিগলি হবে দখলদার বাহিনীর জন্য মরণফাঁদ।

৩. ‘অশুভ অক্ষ’ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু

২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘অশুভ অক্ষ’ (Axis of Evil) তকমা ইরানকে প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেছিল।

  • অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য: আইআরজিসি কেবল অস্ত্র চালায় না, তারা ইরানের অর্থনীতির ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে টেলিকম—সবখানেই তাদের মালিকানা রয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর তারা তাঁর ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে কেবল আদর্শের কারণে নয়, বরং তাদের এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে।

৪. ট্রাম্পের আলটিমেটাম ও আইআরজিসি-র ক্রোধ

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন কুর্দি বা বালুচ বিদ্রোহীদের উসকে দিয়ে ইরানকে ভেতরে থেকে ভাঙতে চাইছেন, তখন তিনি আইআরজিসি-র কয়েক দশকের বিদ্রোহ দমনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

  • বিশ্লেষণ: আইআরজিসি-র কাছে বর্তমান সংঘাত হলো ১৯৭৯ সালের সেই অসমাপ্ত লড়াইয়ের অংশ। তারা মনে করে, পশ্চিমারা সবসময় তাদের দুর্বল করতে চেয়েছে। তাই আত্মসমর্পণ করা তাদের কাছে পরাজয় নয়, বরং আদর্শের অপমৃত্যু।

বিডিএস অ্যানালাইসিস: খামেনির মৃত্যু বা শীর্ষ কমান্ডারদের হারিয়েও আইআরজিসি যে পিছু হঠছে না, তার কারণ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়বোধ। তারা জানে, যদি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তাই তারা ‘সারেন্ডার’ করার চেয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করাকেই শ্রেয় মনে করছে। মার্কিন স্থল বাহিনীর জন্য ইরান হবে এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন, যদি না তারা আইআরজিসি-র এই ‘ডিপ স্টেট’ মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারে।


আইআরজিসি: শক্তির আধার (এক নজরে)

ফিচারের নামপরিসংখ্যান ও বিবরণ
সদস্য সংখ্যা১,৯০,০০০ (নিয়মিত) + ৪,৫০,০০০ (বাসিজ রিজার্ভ)।
নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক খাতনির্মাণ, জ্বালানি, টেলিকম (জিডিপির ২০%+)।
বিশেষ শাখাকুদস ফোর্স (বৈদেশিক অপারেশন)।
বর্তমান নেতাআয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি (সমর্থিত)।
প্রধান কৌশলক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক (হিজবুল্লাহ, হুতি, কাতায়েব)।

তথ্যসূত্র (Sources):

১. Al Jazeera & Reuters: Analysis of IRGC’s role after Khamenei’s death.

২. The Guardian: Iran’s "Deep State" and the business empire of the Guards.

৩. Defense Intelligence Agency (DIA): Report on Iran’s military power and proxies 2026.

৪. বিডিএস পলিটিক্যাল আর্কাইভ: ১৯৭৯-এর বিপ্লব থেকে ২০২৬-এর সংঘাত—আইআরজিসি-র বিবর্তন।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency