| বঙ্গাব্দ

শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, উচ্চশিক্ষা এখন চাকরির নিশ্চয়তা নয় - বাংলাদেশ প্রতিদিন

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 13-08-2025 ইং
  • 3455211 বার পঠিত
শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, উচ্চশিক্ষা এখন চাকরির নিশ্চয়তা নয় - বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবির ক্যাপশন: শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে

উচ্চশিক্ষা এখন চাকরির নিশ্চয়তা নয়: বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা, সরকারের নেই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা

ভূমিকা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দিক হচ্ছে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ-তরুণী। কিন্তু এই যুবশক্তি এখন দেশের জন্য আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষা লাভের পরেও চাকরি না পেয়ে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী হতাশায় ভুগছেন, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বহুগুণে বাড়লেও শিক্ষার মান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিক্ষিত বেকারত্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট (১৯৫০-২০২৫): বেকারত্বের এই সমস্যা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর মূল প্রোথিত আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্যে। ১৯৫০-এর দশকে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল মূলত কেরানি বা প্রশাসনিক কর্মচারী তৈরির উদ্দেশ্যে। স্বাধীনতার পরও সেই ধারার অনেকটাই পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তান আমলের শিক্ষাব্যবস্থা, যা ছিল মূলত চাকরির বাজারে প্রবেশের একটি মাধ্যম, স্বাধীন বাংলাদেশেও তার মূল কাঠামো ধরে রাখে। ১৯৭২ সালে প্রণীত ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন প্রতিবেদন ছিল যুগোপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষার একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু সেই সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এতে শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও মানের দিক থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানেই প্রশ্ন থেকে যায়।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে বেকারত্ব নিরসনের জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সীমিত ও অসম্পূর্ণ ছিল। ২০০৮ সালের জাতীয় যুব নীতি এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগও বিপুল সংখ্যক বেকারের জন্য কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি। বর্তমানে ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, এই সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি: উচ্চশিক্ষিত বেকারের চিত্র বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুসারে, গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ, যা ২০১৭ সালের জরিপের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৩ সালে ২৫ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে মোট বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য রয়েছে, যা মোট কর্মচারীর ২৪.৪০ শতাংশ। কিন্তু এসব পদ পূরণে কোনো সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত: শিক্ষাবিদ এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী নয়। শিক্ষার সঙ্গে কর্মের সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে না, আবার যারা পাশ করে বের হচ্ছেন, তাদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগও নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজ এই প্রসঙ্গে বলেন, "পড়াশোনা শেষ করে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও, সেই তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যারা উচ্চশিক্ষিত, তারা একেবারে বসে থাকেন না। তবে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম আরও বাড়ানো উচিত।"

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান মঙ্গলবার (তারিখটি যুগান্তরে প্রকাশিত) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, "সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। শূন্য পদ পর্যায়ক্রমেই পূরণ হবে। আগের চেয়ে শূন্য পদ অনেক কমে আসছে।" তিনি আরও বলেন, "ক্যাডার পদের উপরের ধাপগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কর্মকর্তা কাজ করছেন, তবে নিচের দিকের পদগুলো হিসাব করলে জনবল কম থাকতে পারে।"

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এসএম আমানুল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নিয়ে খোলাখুলিভাবে বলেছেন, "জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রমে শিক্ষা ও শিল্পের সংযোগ প্রায় শূন্য। অনেক কলেজে ল্যাব নেই, যেখানে রসায়ন, পদার্থ আর জীববিজ্ঞানের পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর দেওয়া হয়। ফলে এখান থেকে লেখাপড়া শেষ করে অনেকেই বেকার থাকেন।"

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সংকট নিরসনে কারিগরি শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করে শিক্ষার্থীর হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার তাগিদ দিয়েছেন।

সমস্যার মূলে কোথায়?

  • সমন্বয়হীনতা: চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা রয়েছে।

  • শিক্ষার মান: দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ইউজিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ৫৫টি সরকারি এবং ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ২০২৩ সালে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫৭ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও, অনেকের মান প্রশ্নবিদ্ধ।

  • পরিকল্পনার অভাব: প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী পাশ করে বের হবেন, কতগুলো নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, বা কতজনকে আত্মকর্মসংস্থানে লাগানো হবে—এসব বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা বা ডেটাবেজ নেই।

  • বেসরকারি খাতের অস্পষ্টতা: বেসরকারি খাতে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান আছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী তরুণ, যাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা না গেলে সামাজিক অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা বৃদ্ধি পাবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বোঝা না করে সম্পদে পরিণত করার জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্লেষণ প্রতিবেদনকারী: বাংলাদেশ প্রতিদিন ডেস্ক

সূত্র:

  • যুগান্তর পত্রিকা (নির্দিষ্ট দিনের কন্টেন্ট)

  • জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

  • বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)

  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)

    প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
    আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency