নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন: জামায়াতের সঙ্গে জোটে এনসিপি, পদত্যাগ করলেন ডা. তাসনিম জারা
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আগামী রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের ঘোষণা আসার কথা রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সবসময়ই জোট এবং আন্দোলনের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫০-এর দশকে যখন ভাষা আন্দোলনের অঙ্কুরোদগম হয়, তখন থেকেই এদেশের মানুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখেছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ছিল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রথম বড় জোটবদ্ধ বিজয়। এরপর ১৯৬৬-এর ৬ দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় প্রমাণ করেছিল জনগণের শক্তির সামনে কোনো শাসকই চিরস্থায়ী নয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন ভিত গড়ে দেয়। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনীতি প্রধানত দুই দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) মেরুকরণে বন্দি থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব সেই চিরাচরিত ধারা ভেঙে দেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৫ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এখন দেশ বড় ধরনের সংস্কার এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) রাতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছে। তিনি বলেন, "ফাইনালি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি জোটে যাচ্ছে। আগামীকাল রবিবার এই বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হবে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের বিপ্লবে অগ্রণী ভূমিকা রাখা তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলটির জামায়াতের সাথে হাত মেলানো একটি কৌশলগত পরিবর্তন। এর আগে ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, "এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে তা তরুণদের রাজনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে।" ধারণা করা হচ্ছে, ৩০০ আসনের মধ্যে এনসিপি প্রায় ৩০টি আসনে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করবে।
দলের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন সুপরিচিত চিকিৎসক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব ডা. তাসনিম জারা। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) তিনি পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। তাঁর এই প্রস্থান এনসিপির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে যারা দলটিকে সেকুলার এবং সংস্কারবাদী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তাদের মাঝে।
গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ঘোষণা করেছিলেন যে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্যে 'জুলাই জাতীয় সনদ' বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত প্রার্থীদের আবেদনের সময়সীমা রয়েছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বড় দলগুলো এবং নতুন দলগুলোর জোট গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে।
১৯৫০ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনার সাথে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল ৫ আগস্টের পর। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে এসে জোট রাজনীতির যে নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে, তা ভোটারদের ভাবিয়ে তুলছে। জামায়াত ও এনসিপির এই জোট বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণ আনে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। ডা. তাসনিম জারার মতো প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারবেন, তাও স্পষ্ট হবে ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে।
সূত্র: ১. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি (ডিসেম্বর ২০২৫)। ২. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং জাতীয় দৈনিক সমূহের আর্কাইভ (১৯৫০-২০২৫)। ৩. সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও এনসিপি-জামায়াত সংশ্লিষ্ট প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |