বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় দরপতন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও শক্তিশালী ডলারের মুখে নিরাপদ বিনিয়োগে টানাপড়েন
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে স্বর্ণের বাজার। একদিনের ব্যবধানে দাম ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর মুহূর্তেই ১.৮ শতাংশ বড় দরপতনের সাক্ষী হলো আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজার (স্পট মার্কেট)। শনিবার (২১ মার্চ, ২০২৬) বাংলাদেশ সময় রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪,৫৬৩.৬৪ ডলারে নেমে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির খবরে ডলার শক্তিশালী হওয়া এবং তেলের বাজারে অস্থিরতাই এই দরপতনের মূল কারণ।
স্বর্ণের বাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই অর্থাৎ ১৯০০ সাল থেকে আজ অবধি যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে স্বর্ণকে 'নিরাপদ বিনিয়োগ' (Safe Haven) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব এবং ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল।
১৯০০-এর দশকের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার পতন পর্যন্ত স্বর্ণ ছিল বিশ্ব অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তবে ২০২৬ সালের এই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। সাধারণত যুদ্ধাবস্থায় স্বর্ণের দাম বাড়ার কথা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার বর্ধিত উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার ফলে মার্কিন ডলারের মান নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেছে। যখন ডলারের মান বাড়ে, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের চেয়ে ডলার বা বন্ডে বিনিয়োগ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিল ডেলিভারির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণ ফিউচার্সের দামও ০.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৫৭৪.৯০ ডলারে নেমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধ প্রস্তুতির কারণে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি (Inflation) বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার (Interest Rate) বাড়াতে বাধ্য করতে পারে।
সাধারণত সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। কারণ স্বর্ণ কোনো নির্দিষ্ট সুদ বা লভ্যাংশ প্রদান করে না। তাই উচ্চ সুদের হারের সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণ ছেড়ে ডলারের মতো সম্পদগুলোতে বেশি ঝুঁকে পড়েন।
ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করার পর মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়েছে। কাতারের গ্যাস শোধনাগার এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো আক্রান্ত হওয়ায় তেলের বাজার এখন চরম অস্থির। ওমান ও কুয়েতের মতো রাষ্ট্রগুলো এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ডলারের শক্তিতেই ভরসা রাখছেন। ২০২৬ সালের এই ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ স্বর্ণের বাজারকে একটি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
১৯০০ সালের সেই ধ্রুপদী অর্থনৈতিক যুগ থেকে ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্বর্ণের দাম এখন কেবল চাহিদার ওপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতির চালিকাশক্তির ওপর নির্ভর করছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সুদের হার আরও বাড়ানো হয়, তবে স্বর্ণের ওপর এই নিম্নমুখী চাপ আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই, ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্স এবং বিশ্ব স্বর্ণ কাউন্সিল (World Gold Council) আর্কাইভ।
বিশ্লেষণ: বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বর্ণ সবসময় সংকটের সঙ্গী। কিন্তু ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ার কারণ হলো ডলারের কৃত্রিম শক্তিশালী অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে স্বর্ণের দাম পুনরায় লাফিয়ে বাড়তে পারে। তবে বর্তমানের এই ১.৮ শতাংশ দরপতন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।
সুত্র: রয়টার্স আন্তর্জাতিক ডেস্ক এবং গোল্ড মার্কেট এনালাইসিস ২০২৬।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |