বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও চাইল্ড রাইটস এনালিস্ট)
ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশে প্রতি ৬৫ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। পরিসংখ্যানটি যতটা না ভয়ের, তার চেয়েও বড় শঙ্কার জায়গা হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। চিকিৎসাবিজ্ঞান একে ‘ডিসঅর্ডার’ বললেও ১৯৯০-এর দশকের জুডি সিঙ্গারের ‘নিউরোডাইভারসিটি’ বা স্নায়ুবৈচিত্র্যতা আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে নতুন এক দর্শনের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশেও এই আন্দোলনের ঢেউ লেগেছে, কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে অটিজম সম্পন্ন শিশু ও তাদের মা-বাবাদের সংগ্রাম আজও এক নিভৃত কান্নার গল্প।
বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসে একসময় অটিজম বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ‘পাগল’ কিংবা ‘অভিশপ্ত’ বলে শিকলবন্দি করে রাখার অন্ধকার ইতিহাস রয়েছে।
বিবর্তনের ধারা: ২০০৮ সালে জাতিসংঘ যখন ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, তখন থেকে বাংলাদেশেও সরকারি পর্যায়ে আলোচনার শুরু হয়। তবে আশির দশকে বা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই শিশুদের কোনো সামাজিক অস্তিত্ব ছিল না। তারা ছিল পরিবারের এক গোপন বোঝা।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালে এসে আমরা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ’ বা ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’র বড় বড় বুলি আউড়ালেও, বাস্তবতায় একজন মা-কে আজও তাঁর ক্যারিয়ার ছাড়তে হয় সন্তানের দেখভালের জন্য। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর এক বড় ব্যর্থতা।
নিবন্ধে একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া হয়েছে—অফিসে র্যাম্প থাকলে যেমন একজন শারীরিক প্রতিবন্ধীর জন্য বাধা থাকে না, তেমনি সমাজ যদি অটিস্টিক শিশুর ‘স্টেমিং’ (পৌনপুনিক আচরণ) স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, তবে তাদের জন্য পৃথিবীটা সহজ হয়ে যায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ইতিহাসে দেখা গেছে, আলবার্ট আইনস্টাইন বা আইজ্যাক নিউটনের মতো কিংবদন্তিদের মধ্যেও অনেক অটিস্টিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁরা যদি আজকের বাংলাদেশের তথাকথিত ‘দুষ্টু’ বা ‘বেয়াদব’ তকমা নিয়ে বড় হতেন, তবে পৃথিবী হয়তো তাঁদের মেধা থেকে বঞ্চিত হতো। অটিজম মানেই অক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি ভিন্নভাবে কাজ করা মস্তিষ্ক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অটিজম কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি একটি চরম অর্থনৈতিক সংকটও।
আর্থিক সংকট: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন স্কুলের খরচ সাধারণ স্কুলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। যেহেতু বেশিরভাগ মাকে চাকরি ছাড়তে হয়, তাই পরিবারের আয় কমে যায়। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা থেরাপি বা বিশেষ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।
পিতা-মাতার আকুতি: পৃথিবীর সব বাবা-মা সন্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করলেও, অটিস্টিক শিশুর মা-বাবারা প্রার্থনা করেন—“সন্তানের চেয়ে আমি যেন একদিন বেশি বাঁচি।” এই একটি বাক্যই বলে দেয়, আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা দিতে কতটা ব্যর্থ হয়েছে।
বিডিএস অ্যানালাইসিস: বাংলাদেশে অটিজম সচেতনতা কেবল ঢাকা বা বড় শহরকেন্দ্রিক ‘সেমিনার’ বা ‘র্যালি’তে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উপজেলা পর্যায়ে ডে-কেয়ার সেন্টার এবং অটিজমবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা (যেমন: ডক্টরস অ্যাপয়েন্টমেন্টে অগ্রাধিকার) নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভ্যাকসিনেশন বা জরুরি চিকিৎসায় তাদের জন্য বিশেষ প্রোটোকল না থাকাটা মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
| সংকট | ঐতিহাসিক প্রভাব | ২০২৬-এর সমাধান |
| সামাজিক লজ্জা | কুসংস্কার ও ওঝা-বৈদ্যের ওপর নির্ভরতা। | গণমাধ্যমের মাধ্যমে ‘নিউরোডাইভারসিটি’র প্রচার। |
| শিক্ষাব্যবস্থা | মূলধারার স্কুল থেকে বহিষ্কার। | এডিএইচডি ও এডিডি বান্ধব ‘ইনক্লুসিভ স্কুলিং’। |
| চিকিৎসা সংকট | দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে না পারা। | বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও সেন্সরি-ফ্রেন্ডলি ক্লিনিক। |
| ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা | মা-বাবার মৃত্যুর পর অনাথ হওয়া। | রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ও পেশাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। |
অটিজম কোনো রোগ নয় যে ওষুধে সেরে যাবে; এটি একটি আজীবনের বৈশিষ্ট্য। যত দ্রুত শনাক্ত হবে, তত দ্রুত শিশুটিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশের বিশেষায়িত শিক্ষক ও থেরাপিস্টদের আন্তরিকতা প্রশংসনীয় হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। আমাদের দরকার এমন এক সমাজ, যেখানে একটি শিশু রেস্তোরাঁয় বসে শব্দ করলে মানুষ বিরক্তি নিয়ে তাকাবে না, বরং হাসিমুখে তার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |