| বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন পাহারা: ২৪ ঘণ্টায় ৩১টি বাণিজ্যিক জাহাজ পারাপার

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 21-05-2026 ইং
  • 1704 বার পঠিত
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন পাহারা: ২৪ ঘণ্টায় ৩১টি বাণিজ্যিক জাহাজ পারাপার
ছবির ক্যাপশন: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন পাহারা

উত্তেজনার পারদ চড়ছে মধ্যপ্রাচ্যে: হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ৩১টি জাহাজ পারাপার, কড়া পাহারা ও নতুন নিয়ম জারি করল ইরান

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ ($Strait\ of\ Hormuz$) দিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩১টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে ২০২৬) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনীর বরাতে দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম (Tasnim News Agency) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আইআরজিসির ($IRGC$) পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই জলপথ অতিক্রম করা জাহাজগুলোর মধ্যে বিশালাকার খনিজ তেলবাহী ট্যাংকার, কার্গো কনটেইনার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আইআরজিসি দাবি করেছে যে প্রতিটি জাহাজই তাদের নৌবাহিনীর সরাসরি ‘সমন্বয়, ট্র্যাকিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে’ অত্যন্ত নিরাপদে এই প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে।

১. হরমুজে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ: নতুন গঠিত ‘পিজিএসএ’ (PGSA)

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা ও ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। তবে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও ইরান এই জলপথের ওপর নিজের সার্বভৌমত্ব ও আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

চলতি সপ্তাহেই (১৮ মে ২০২৬) ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (Persian Gulf Strait Authority - PGSA) নামক একটি নতুন রেগুলেটরি বডি বা নৌ-কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এখন থেকে হরমুজ প্রণালির ইরানি জলসীমা বা এর সংলগ্ন নির্দিষ্ট জোন দিয়ে যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজ পারাপারের ক্ষেত্রে এই কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি এবং ‘ট্রানজিট পারমিট’ নেওয়া সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

২. নিয়ন্ত্রণের সীমানা নির্ধারণ ও নতুন ট্রানজিট প্রটোকল

২১ মে ২০২৬-এ পিজিএসএ ($PGSA$) তাদের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে তাদের আইনি এখতিয়ার বা জুরিসডিকশনের সীমানা স্পষ্ট করেছে। ইরানের কুহ মোবারক থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ($UAE$) ফুজাইরাহ বন্দরের দক্ষিণ দিক পর্যন্ত এবং ওদিকের কিশমিশ দ্বীপ থেকে উম্ম আল-কুওয়াইন পর্যন্ত বিশাল জলসীমাকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

  • কঠোর ডেটা স্ক্রিনিং: প্রণালি পার হতে ইচ্ছুক যেকোনো জাহাজকে তাদের মালিকানা, বীমা (Insurance), ক্রু তালিকা, কার্গো বা মালের বিবরণসহ প্রায় ৪০টিরও বেশি তথ্য প্রদান করে info@PGSA.ir ইমেইলের মাধ্যমে আবেদন করতে হচ্ছে।

  • ব্ল্যাকলিস্ট ও কড়াকড়ি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিশেষ নৌ-মিশনের বা ইসরায়েল সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজকে এই প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তবে চীন বা রাশিয়ার মতো বন্ধুভাবাপন্ন দেশের জাহাজগুলো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির বর্তমান নৌ-চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ মেট্রিিক্স

ভূরাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালির (Strait of Hormuz) নৌ-চলাচল ব্যবস্থা বর্তমানে তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে এবং এটি প্রায় সম্পূর্ণ ইরানি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টটি দিয়ে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ঐতিহাসিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সম্প্রতি মে ২০২৬-এ ইরান এই প্রণালির ওপর নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। 
বর্তমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নিয়মাবলী (মে ২০২৬)
  • পিজিএসএ (PGSA) গঠন: ইরান মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে 'পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি' (PGSA) নামে একটি নতুন আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা চালু করেছে। অনুমতি ছাড়া এই প্রণালি দিয়ে যেকোনো যাতায়াতকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
  • আইআরজিসি (IRGC)-এর সামরিক নির্দেশ: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এই রুটকে একটি কঠোর 'নো-গো জোন' (No-Go Zone) হিসেবে ঘোষণা করেছে। যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে ইরানি নৌবাহিনীর রুট ও ইলেকট্রনিক নির্দেশনা মেনে চলতে হচ্ছে।
  • নির্বাচিত জাহাজ চলাচল: শত্রুপক্ষ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নৌ অভিযানের সাথে যুক্ত জাহাজের জন্য এই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ। শুধুমাত্র ইরান সমর্থিত বা বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর (যেমন: চীন, ভারত, রাশিয়া) বাণিজ্যিক জাহাজ নির্দিষ্ট ফি বা শুল্ক পরিশোধ এবং কড়া নজরদারির মাধ্যমে যাতায়াতের অনুমতি পাচ্ছে।
  • অবস্থান ট্র্যাকিং বন্ধ: প্রণালি পার হওয়ার সময় জাহাজগুলোকে তাদের লোকেশন ট্রান্সপন্ডার (AIS) এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। 
নৌ-চলাচল ও ট্রাফিক মেট্রিিক্স
ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমান ট্রাফিক পরিস্থিতি প্রায় ধসে পড়েছে: 
মেট্রিক (Metric) স্বাভাবিক সময় (সংঘাতের পূর্বে)বর্তমান পরিস্থিতি (মে ২০২৬)
দৈনিক জাহাজ চলাচল (Daily Transits)গড়ে ৬০ থেকে ১৩৮টি জাহাজমাত্র ২ থেকে ৩টি জাহাজ (মাঝে মাঝে চীনা ও ভারতীয় ট্যাংকার চলাচল করছে)
জ্বালানি তেল পরিবহনদৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল (বিশ্বের ২০-২৫% সেবোর্ন অয়েল)স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ৪-৫% থ্রুপুট বজায় রয়েছে
কন্টেইনার সক্ষমতা জট০% (স্বাভাবিক প্রবাহ)পার্সিয়ান উপসাগরে প্রায় ৪৭০,০০০ TEUs কন্টেইনার আটকা পড়েছে
ফ্রেইট রেট বৃদ্ধি (Ocean Freight)স্বাভাবিক রেটট্রান্সপ্যাসিফিক রুটে ৪০% এবং এশিয়া-ইউরোপ রুটে ২০% খরচ বৃদ্ধি
যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম (War Risk Insurance)স্বাভাবিকবর্তমানে চরম (Extreme) ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাটাগরি
বিকল্প রুট ব্যবহার (Rerouting)০%জাহাজগুলো আফ্রিকার 'কেপ অব গুড হোপ' দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে, যা যাত্রায় ১০-১৪ দিন বেশি সময় বাড়িয়েছে
সাম্প্রতিক আপডেট (মে ২০, ২০২৬) 
রয়টার্সের শিপিং ডেটা অনুযায়ী, দীর্ঘ দুই মাস উপসাগরে অবরুদ্ধ থাকার পর সম্প্রতি ৬ মিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেলসহ তিনটি চীনা সুপারট্যাঙ্কার ইরানের দেওয়া বিশেষ ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিলেও প্রণালির সামগ্রিক সামরিক উত্তেজনা এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

ভবিষ্যৎ রূপরেখা: বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের ওপর প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ট্রানজিট প্যাসেজের আওতাভুক্ত হলেও, ইরান যেভাবে এই রুটে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ফি ও ক্লিয়ারেন্স মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করেছে—তা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই এই রুট এড়াতে ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে নতুন তেল পাইপলাইন নির্মাণের কাজ দ্রুততর করছে। তবে বর্তমান ২০২৬ সালের মে মাসের এই পরিস্থিতিতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আইআরজিসির এই দৈনিক ক্লিয়ারেন্সের ওপর ভর করেই বৈশ্বিক ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের বাণিজ্য সচল রয়েছে।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

মধ্যপ্রাচ্য সংকট, হরমুজ প্রণালি, আইআরজিসি, পিজিএসএ ট্রানজিট প্রটোকল এবং আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের গভীর ও প্রফেশনাল ইনফরমেশনাল কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency