| বঙ্গাব্দ

৯ বছরের আইনি লড়াই ও ১৮ কোটি টাকা খরচ; প্রতারক স্ত্রীর ৬৫ বছরের জেল

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 15-07-2026 ইং
  • 10425 বার পঠিত
৯ বছরের আইনি লড়াই ও ১৮ কোটি টাকা খরচ; প্রতারক স্ত্রীর ৬৫ বছরের জেল
ছবির ক্যাপশন: ৯ বছরের আইনি লড়াই ও ১৮ কোটি টাকা খরচ

সিনেমার গল্পকেও হার মানাল বাস্তব: স্বামীকে হত্যাচেষ্টা ও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালানো ঝাং শুদানের ৬৫ বছরের জেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

সর্বশেষ আপডেট: ১৫ জুলাই, ২০২৬

প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, স্বামীকে সুপরিকল্পিত সড়ক দুর্ঘটনায় হত্যার নিখুঁত ছক কষা, ভুয়া সন্তান প্রসব এবং সবশেষে জাল নথিপত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়া। কোনো রোমাঞ্চকর হলিউড বা বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্য মনে হলেও, এটি আসলে চীনা ধনকুবের বিনিয়োগকারী ৫২ বছর বয়সি লি পিং-এর বাস্তব জীবনের এক চরম অবিশ্বাস্য ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের গল্প।

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রায় ১৮ কোটি রুপি (১৩ মিলিয়ন ইউয়ান বা ১.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) নিজের পকেট থেকে খরচ করে অবশেষে তাঁর প্রতারক সাবেক স্ত্রীকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লি পিং-এর শেয়ার করা ১৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র সদৃশ ভিডিও এই মুহূর্তে সমগ্র চীন ও বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে যেভাবে কোটিপতির স্ত্রী

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে চীনের শেয়ারবাজারে সফল বিনিয়োগ করে প্রায় ৭ কোটি ইউয়ান (১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) আয় করে ব্যাপক প্রতিপত্তি অর্জন করেন লি পিং।

২০১৪ সালে একটি ব্যবসায়িক ফোরামে লির সাথে পরিচয় হয় ঝাং শুদান নামের এক সাধারণ নারী ব্যাংক কর্মকর্তার। ঝাং নিজেকে অত্যন্ত দরিদ্র ও সংগ্রামী পরিবারের সন্তান হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা লির মন গলিয়ে দেয়। তবে লির দাবি, ঝাং মূলত তাঁর বিপুল আর্থিক প্রতিপত্তি দেখেই সুপরিকল্পিতভাবে প্রেমের ফাঁদ পেতে লির জীবনে প্রবেশ করেছিলেন।

ঝাংয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর ব্যাংকে ২ কোটি ইউয়ান জমা রাখেন লি এবং ঝাংয়ের তথাকথিত পালক বাবা-মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসার নাম করে বিভিন্ন সময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ সাহায্য করতে শুরু করেন। ২০১৫ সালের শুরুতে ঝাং বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং মার্চ মাসে দাবি করেন তিনি গর্ভবতী। আনন্দে আত্মহারা হয়ে লি তাঁর হবু স্ত্রীর জন্য শেনঝেন শহরে ৭৫ লাখ ইউয়ানের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট উপহার দেন এবং ওই বছরের এপ্রিলেই তারা ধুমধাম করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

বিয়ের পরদিনই ব্রেক ফেল ও নিখোঁজ রহস্য

কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হয় বিয়ের ঠিক পরের দিনই। লি যখন সড়কপথে শেনঝেন ফিরছিলেন, তখন হাইওয়েতে তাঁর গাড়ির ব্রেক হঠাৎ সম্পূর্ণ বিকল হয়ে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। অলৌকিকভাবে সে যাত্রায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান লি।

এর কয়েক দিন পর, নিজের ব্যাংকের পারফরম্যান্স ভালো দেখানোর টার্গেটের অজুহাত দিয়ে ঝাং তাঁর নতুন স্বামীর কাছ থেকে প্রায় ২৭ লাখ ইউয়ান হাতিয়ে নেন। এর পরপরই নিজের সমস্ত নথিপত্র এবং লির কেনা ৪টি বিলাসবহুল সম্পত্তির মূল মালিকানার দলিলপত্র নিয়ে এক রাতের ব্যবধানে উধাও হয়ে যান ঝাং। পরবর্তীতে পুলিশি তদন্তে জানা যায়, ঝাং সীমান্ত পাড়ি দিয়ে হংকং হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পালিয়ে গেছেন।

🔎 তদন্তে বেরিয়ে আসা গা শিউরে ওঠা সব তথ্য:
• বিয়ের পরদিন গাড়ি দুর্ঘটনা: ব্রেক তার কেটে দেওয়ার পেছনে হাত ছিল ঝাং ও তার প্রেমিকের/সহযোগীর।
• মূল উদ্দেশ্য: স্বামীকে খুন করে স্ত্রী হিসেবে লির সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হওয়া।
• ভুয়া সন্তান প্রসব: যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়ে লির সন্তান দাবি করলেও ডিএনএ পরীক্ষায় তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

১০ লাখ ডলার পুরস্কার ও বিশ্বজুড়ে তল্লাশি

লি পিং জানান, “সে কেবল টাকা চুরি করে পালালে আমি হয়তো ওর পেছনে এভাবে লাগতাম না। কিন্তু সে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার চক্রান্ত করেছিল, যাতে আমার শত কোটি টাকার সম্পত্তির একক মালিক বনে যেতে পারে। আমি একে কোনোভাবেই ছেড়ে দিতে পারতাম না।”

প্রতারক স্ত্রীকে খুঁজে বের করতে লি পিং ব্যক্তিগতভাবে ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বিশাল পুরস্কার ঘোষণা করেন। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশেই নামী দামি ব্যক্তিগত গোয়েন্দা সংস্থা (Private Detective) এবং আন্তর্জাতিক আইনজীবী নিয়োগ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের গির্জা, চীনা মেস, সামাজিক কমিউনিটি সেন্টার এবং সন্দেহভাজন প্রসূতি কেন্দ্রগুলোতে একটানা তল্লাশি চালানো হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের ক্লান্তিহীন অনুসন্ধান এবং প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের পর অবশেষে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি গোপন ফ্ল্যাটে সন্ধান মেলে ঝাং ও তাঁর সন্তানের। পরবর্তীতে ডিএনএ (DNA) টেস্টে প্রমাণিত হয়, ওই সন্তান লির রক্তের নয়, সম্পূর্ণ ভুয়া ও সাজানো।

অবশেষে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে ৬৫ বছরের সাজা

আইনি লড়াইয়ের শুরুটা সহজ ছিল না। কারণ ঝাং খাতায়-কলমে তখনো লির বৈধ স্ত্রী থাকায় প্রথম দিকে ফেডারেল জালিয়াতির মামলাটি থমকে গিয়েছিল। তবে ২০২০ সালে শেনঝেনের একটি ফ্যামিলি কোর্ট তাঁদের বিয়ে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে এবং হাতিয়ে নেওয়া ৪টি সম্পত্তি লি-এর নামে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

⚖️ ক্যালিফোর্নিয়া আদালতের রায় (২০২৪):
ঝাং শুদানকে মোট ২৩টি গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
১. আন্তর্জাতিক আর্থিক জালিয়াতি
২. অবৈধ মার্কিন সীমান্ত প্রবেশ ও ভিসা জালিয়াতি
৩. শিশু অপহরণ ও মানবপাচার
👉 শাস্তি: মোট ৬৫ বছরের কারাদণ্ড।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত ঝাং শুদানকে সবকটি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৬৫ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড প্রদান করে জেলের খাঁচায় পাঠায়। একই সাথে ঝাংকে দেশ থেকে পালাতে এবং গাড়ি দুর্ঘটনার নীল নকশা তৈরিতে সাহায্য করা তাঁর চীনা সহযোগীদের বিরুদ্ধেও চীনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজয়ী বীর লি পিং।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency