প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের চলমান ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদী এবং এর শাখা নদীগুলোকে ঘিরে এক বিশাল অবৈধ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে ইলিশ শিকার, নদীপথে পাহারা দেওয়া এবং গোপনে মাছ বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার নামে চলছে এই রমরমা ‘নিরাপত্তা বাণিজ্য’। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলারপ্রতি ২ হাজার টাকা এবং রাতের বেলায় বসা গোপন নিলাম হাটে বিক্রিত অর্থের ১০ শতাংশ চাঁদা হিসেবে তুলছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
প্রতিবছর অক্টোবরে মা ইলিশ রক্ষায় নদ-নদীতে সব ধরনের মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। এ বছর এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে গত ৮ আগস্ট থেকে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে অভিযান চালালেও বরিশালের হিজলার অন্তরবাম এবং মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া এলাকা বরাবরই আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এই দুই পয়েন্টে প্রতিদিন জোট বেঁধে হাজার হাজার জেলে নদীতে নেমে ইলিশ শিকার করেন। নদী পাহারা দেওয়া মৎস্য বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গেলে উল্টো হামলার শিকার হন কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহেও জেলেদের হামলায় মৎস্য বিভাগের একজন কর্মী আহত হয়েছেন।
এ বিষয়ে বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন:
"অভিযানিক দলে জনবল কম থাকলেই এই দুই পয়েন্টে সংঘবদ্ধ জেলেরা হামলা চালায়। সংখ্যায় তারা শত শত হওয়ায় এককভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।"
মৎস্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সব সরকারের আমলেই নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে ইলিশ নিয়ে রমরমা বাণিজ্য করে আসছে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। বর্তমানে সেই একই কায়দায় ও দায়িত্ব পালন করছে বর্তমান প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা। কেবল মাছ ধরা নয়, নদীর বুকে জেলেদের টিকিয়ে রাখা এবং গোপনে ইলিশ বিক্রির নিরাপদ ব্যবস্থাও করে দেয় এই চক্রটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামার প্রতিটি ট্রলারকে দিতে হয় ২ হাজার টাকা করে। এছাড়া মেঘনা পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে বসা ৬টি গোপন নিলামের হাটেও রয়েছে নেতাদের নিজস্ব লোকজন।
জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী:
নিরাপত্তা ও ছাড় পাওয়ার সুবিধা: টাকা দেওয়ার বিনিময়ে অভিযানের সময় জেলেদের সঙ্গে নেতাদের লোকজনও ট্রলারেই অবস্থান করেন। কোস্ট গার্ড বা মৎস্য বিভাগ ধাওয়া করলে তারাই বাধা দেন। তাছাড়া কোনো জেলে ধরা পড়লেও সামান্য কিছু জরিমানা দিয়ে বাকিদের ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেন এই নেতারা।
দৈনিক চাঁদার পরিমাণ: ট্রলারের এন্ট্রি ফি এবং মাছ বিক্রির কমিশন মিলিয়ে প্রতিদিন নেতাদের পকেটে যায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা!
সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোররাত পর্যন্ত শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের পাইকারি মাছ ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ৬টি পয়েন্টে গোপনে বসে কোটি টাকার ইলিশের হাট।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যেসব পয়েন্টে চাঁদা তোলা হয় তার মধ্যে রয়েছে—
টুমচর নদীর পাড় (বেবজিয়াপাড়া): রিফাত ও আবুপুর লঞ্চঘাট এলাকায় খালিদ।
নাচোকাঠি: চুন্নু ও ফরহাদ।
শংকরপাশা-কাকুড়িয়া: ইসমাইল, বাসার, নোমান ফারুক, মোস্তফা, আলম ও দুলু।
অন্তরবাম-চরকিল্লা-জানপুর: খোকা ও লিটন।
৩ নম্বর মাছ ঘাট: খোকা, তার ছেলে ও ভাগনেরা।
এছাড়া মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারে বসা খোলা বাজার থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। সংগৃহীত এই সমস্ত টাকা সংগ্রহ করে নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল দায়িত্বে রয়েছেন তাহের ও আলাউদ্দিন নামের দুই ব্যক্তি। স্থানীয়দের মতে, এরা ‘সবসময়ের সরকার’ অর্থাৎ রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান বদল করে উভয় আমলেই এই অবৈধ বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রেখেছেন।
অভিযোগের তির রয়েছে হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি-র দিকে। পুরো নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন ইলিশ বাণিজ্যের গডফাদার হিসেবে তিনিই এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। তাহেরের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেলেও আলাউদ্দিন দাবি করেন, “আমি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, আমি এসবের কোনো কিছুর সঙ্গেই জড়িত নই।”
একইভাবে অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার দাবি করে খোকন দপ্তরি বলেন, “আমি কেন নিষেধাজ্ঞার সময়ে অবৈধ ইলিশ শিকারে সহায়তা করতে যাব?”
এদিকে জেলেদের ছাড়িয়ে আনা বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে জানান:
"অভিযানিক দলের হাতে ধরা পড়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা বা অর্থদণ্ড ছাড়া কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। গত ৯ দিনে আইনের বাইরে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। যদি সুনির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের প্রমাণ কেউ দিতে পারেন, তবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |