প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ইসরাইলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জনমত জরিপগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা টানাপোড়েনের কথা বললেও, তা কখনোই সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারে না। কখনো জরিপে দেখা যায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট আবারও ক্ষমতায় ফেরার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, আবার কখনো গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ‘পরিবর্তন’ জোটকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে এই জরিপের ক্রমাগত ওঠা-নামার আড়ালে লুকিয়ে আছে ইসরাইলের এক ভয়াবহ বাস্তবতা—নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর বিরোধী পক্ষ, কারও জন্যই একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠনের পথ মোটেই মসৃণ নয়।
বেলজিয়ামভিত্তিক রাজনীতি বিজ্ঞান বিশ্লেষক তামের আজরামি-র মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘মিডল ইস্ট মনিটর’-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধের বিশেষ অনুবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইসরাইলের এই চলমান গভীর রাজনৈতিক সংকটের নানা সূক্ষ্ম সমীকরণ।
ইসরাইলি রাজনীতির মূল সমস্যাটি শুধু পার্লামেন্ট বা নেসেটের (Knesset) আসন সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মূল বিষয় হলো কে এই আসনগুলোকে বাস্তবে একীভূত করে সরকারে রূপান্তর করতে পারবে।
নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, তাঁর জোট হয়তো কোনোভাবেই এককভাবে ন্যূনতম ৬১টি আসনের জাদুকরী সংখ্যায় পৌঁছাতে পারবে না। তাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য এখন কেবল সরকার গঠন করা নয়; বরং বিরোধীরা যাতে কোনোভাবেই বিকল্প সরকার গড়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারে, তা সুনিশ্চিত করা। অর্থাৎ, তিনি নিজে সরকার গঠন করতে না পারলে অন্য কাউকেও যেন তা করতে না দেন—এই নীতিতেই তিনি এগোচ্ছেন।
ডানপন্থি ভোটের সমীকরণ: ওফার উইন্টারের মতো পরিচিত মুখ এবং ছোট ছোট চরম ডানপন্থি দলগুলো যদি পার্লামেন্টে প্রবেশের ন্যূনতম ভোটের দোরগোড়া পেরোতে পারে, তবেই নেতানিয়াহুর জোট লাভবান হবে। অন্যথায় সেই মূল্যবান ভোটগুলো অপচয় হয়ে পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
বেন-গ্যভিরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা: উগ্র ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গ্যভিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নেতানিয়াহু একদিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, আবার অন্যদিকে ডানপন্থিদের একটি আসনও যেন হাতছাড়া না হয়, সে বিষয়েও তিনি সজাগ।
পুরো ইসরাইলি রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অনুঘটক হলো দেশটিতে বসবাসকারী আরব নাগরিক ও ভোটাররা। আরব নাগরিকদের ভোটের হার যদি বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়, তবে তা নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরার পথ পুরোপুরি আটকে দিতে পারে।
এখানে ‘পরিবর্তন’ জোটের সামনে বড় রাজনৈতিক উভয় সংকট বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে:
আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাহায্য ছাড়া ‘পরিবর্তন’ জোট যদি সরকার গঠনের মতো ৬০ বা ৬১ আসন না পায়, তবে তারা কি আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়ার সাহস দেখাবে?
ইসরাইলের ডানপন্থি রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আরবদের বিরুদ্ধে তীব্র বৈরী প্রচারণাকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফলে কোনো সরকার যদি আরব দলগুলোর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে, তবে নেতানিয়াহু ও তাঁর অনুসারীরা প্রথম দিন থেকেই সেটিকে ‘অবৈধ সরকার’, ‘ইসরাইলের শত্রুদের সমর্থিত সরকার’ কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ বলে তীব্র আক্রমণ করবে।
আরব দলগুলোর রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ডকে কেন্দ্র করে যদি বিরোধীরা এক পা পিছিয়ে যায় এবং কোনো পক্ষই সরকার গড়তে না পারে, তবে নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যই অর্জিত হবে—অর্থাৎ দেশে সৃষ্টি হবে চূড়ান্ত ‘রাজনৈতিক অচলাবস্থা’ (Political Stalemate)।
ফলে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারবেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে একটি বড় কৌশলগত জয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই লড়াই কেবল নির্বাচনে আসন জেতার লড়াই নয়; বরং কার সরকার গঠনের রাজনৈতিক বৈধতা রয়েছে, তা একচ্ছত্রভাবে নির্ধারণ করার লড়াই। নির্বাচনকে ঘিরে ভুয়া তথ্য প্রচার, এআই-নির্মিত (AI) বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানো এবং আরব-অধ্যুষিত শহরগুলোতে চরমপন্থি ডানপন্থি পর্যবেক্ষকদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে ভোট ব্যাহত করার আশঙ্কায় মুখর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন বন্ধ হলেই ধ্বংস হয় না; বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার অর্থ যখন নষ্ট হয়ে যায় এবং এক পক্ষ কেবল নিজেদের বিজয়ের শর্তেই নির্বাচনকে বৈধ বলে মনে করে, তখনই গণতন্ত্র ধসে পড়ে। ফলে বর্তমানে বড় প্রশ্নটি স্রেফ কে নির্বাচনে জিতবে তা নয়; বরং নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো নির্বাচনের গণতান্ত্রিক ফলাফল কি শেষ পর্যন্ত মেনে নেবে ইসরাইলি রাজনৈতিক ব্যবস্থা?
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |