ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় কারাগারে থাকা স্বামীকে ছাড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গৃহবধূকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, যুবদল নেতা বহিষ্কার
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় কারাগারে বন্দি স্বামীকে আইনি সহায়তার মাধ্যমে দ্রুত মুক্ত করে দেওয়ার লোভনীয় আশ্বাস দিয়ে এক প্রৌঢ়া নারীকে (৪৫) নিজ ঘরে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউনিয়ন যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারীর ধারণকৃত একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে অভিযুক্ত যুবদল নেতার বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়া থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ওই নারী। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান।
অভিযুক্ত যুবদল নেতার নাম হযরত আলী মণ্ডল (৩৮)। তিনি ফুলবাড়িয়া উপজেলার একটি স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং একই সঙ্গে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে এলাকায় জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
মামলার বিবরণ ও ঘটনার পটভূমি
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর একটি মারামারির মিথ্যা মামলায় ভুক্তভোগী নারীর স্বামী গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাবাস করছেন। স্বামীর অনুপস্থিতি ও মুক্তির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত যুবদল নেতা হযরত আলী ওই নারীর বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন এবং তাঁর স্বামীকে জেলখানা থেকে খুব দ্রুত ছাড়িয়ে দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস দিতে থাকেন।
গত ২০ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে হযরত আলী ওই নারীর বাড়িতে এসে বিভিন্ন অজুহাতে তাকে কুপ্রস্তাব দেন। এতে নারীটি জোরালোভাবে অস্বীকৃতি জানালে লম্পট হযরত আলী তাঁকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালান বলে মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সময় ওই নারীর আর্তচিৎকারে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত এগিয়ে আসলে অভিযুক্ত যুবদল নেতা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
ভুক্তভোগী নারীর বক্তব্য ও ভিডিও ধারণের পেছনের কথা
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ভুক্তভোগী নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, “স্বামীর চরম বিপদের দিনে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে হযরত আলী আমাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করত। ঘটনার দিনও সে একাধিকবার বাড়িতে আসে এবং নানা কথা বলে আমাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। আমি রাজি না হলে সে ঘরের ভেতর জোরপূর্বক ঢুকে আমাকে জাপটে ধরে বিছানায় ফেলে দেয়।”
নিজের ইজ্জত ও নিরাপত্তা রক্ষায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই নারী বলেন, “আগে থেকেই আমার মনের মধ্যে একটা সন্দেহ ও ভয় কাজ করছিল। তাই নিজের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কথা ভেবে আমি আগে থেকেই আমার মোবাইল ফোনের ভিডিও অপশন চালু করে রেখেছিলাম। যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বা জঘন্য ঘটনা ঘটলে আমার হাতে অকাট্য প্রমাণ থাকে, সে উদ্দেশ্যেই আমি গোপনে ভিডিওটি ধারণ করি। পরবর্তীতে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর স্বামীকে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। স্বামীকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে তিনি বিভিন্ন জায়গায় দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। পরবর্তীতে আইনজীবীর মাধ্যমে গত সোমবার তাঁর স্বামী আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। বর্তমানে লম্পট হযরত আলী ও তার সহযোগীরা বিভিন্নভাবে তাকে ও তার পরিবারকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে। তিনি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
পুলিশের পদক্ষেপ ও যুবদলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান গণমাধ্যমকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটিতে স্পষ্টতই ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টার লোমহর্ষক দৃশ্য দেখা গেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় নিয়মিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত হযরত আলী মণ্ডল পলাতক রয়েছেন। তাঁকে দ্রুত গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান পরিচালনা করছে। এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য অভিযুক্ত হযরত আলীর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ফুলবাড়িয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি কামরুজ্জামান মীর আজাদের নজরে আসে। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, “সংগঠনের শৃঙ্খলা পরিপন্থী এমন জঘন্য অপরাধের বিষয়টি নিয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করেছি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত হযরত আলীকে যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।”