| বঙ্গাব্দ

. সাজেকে চতুর্থ দফায় সড়ক অবরোধ, ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা পর্যটন খাতে

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 03-11-2026 ইং
  • 40297 বার পঠিত
. সাজেকে চতুর্থ দফায় সড়ক অবরোধ, ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা পর্যটন খাতে
ছবির ক্যাপশন: সাজেকে সড়ক অবরোধ

সাজেকে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ, পর্যটন খাতে ক্ষতি ৩৫ কোটি টাকা

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে পাঁচ দফা দাবিতে চলমান অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের আলোচনায় পাঁচ দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধের সমাধান না হওয়ায় কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এতে পর্যটন, পরিবহণ ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়। তবে কৃষিপণ্য পরিবহণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহনকে অবরোধের আওতামুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

কৃষিপণ্য ও শিক্ষার্থীদের পরিবহণে ছাড়

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এবং সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা বিবৃতিতে জানান, দুই সংগঠনের যৌথ সভায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে—

  • স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহণকারী যানবাহন।

  • স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যান।

  • জরুরি রোগী পরিবহণে অ্যাম্বুলেন্স।

  • বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে নিয়োজিত গাড়ি।

  • ধর্মীয় ও বিবাহ অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত যানবাহন।

  • সাংবাদিকদের যানবাহন।

আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, এসব ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলেও সাজেকবাসীর পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলবে।

চতুর্থ দফায় অবরোধ, বন্ধ যান চলাচল

এর আগে ১ নভেম্বর এক দিনের জন্য অবরোধ কর্মসূচি শিথিল করা হয়েছিল। তবে সোমবার (২ নভেম্বর) থেকে নতুন করে সড়ক অবরোধ শুরু করেন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতাকর্মীরা।

মঙ্গলবারও সাজেক পর্যটন সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের গুঁড়ি ফেলে এবং আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।

এর ফলে সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও খাগড়াছড়ির যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চার দাবিতে সমঝোতা হলেও মূল বিরোধ অমীমাংসিত

গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

তবে সাজেক এলাকা থেকে জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

পরবর্তী সময়ে আরও একটি সংলাপ আয়োজনের আশ্বাস দেওয়া হলেও নতুন বৈঠকের বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান জানিয়েছেন, নতুন করে বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও জানান, অবরোধের কারণে নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সাজেকভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

পর্যটন খাতে ৩০-৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি

দীর্ঘদিন পর্যটক না আসায় সাজেকের পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জানান, অবরোধের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

তিনি জানান, সাজেকে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—

  • ১১৬টির বেশি রিসোর্ট ও কটেজ।

  • ১৪টি রেস্তোরাঁ।

  • শতাধিক ছোট-বড় দোকান।

পর্যটক না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রিসোর্ট ও কটেজ মালিক, কর্মচারী, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশার মানুষ আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে স্থানীয়রা

সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সাজেকের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনেও সংকট তৈরি হয়েছে। চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাতায়াত নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানান, স্থানীয় অনেক পরিবারের ঘরে মজুত খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য শেষ হয়ে গেছে। রুইলুইপাড়ার পাঁচটি দোকানেও প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুত শেষ হয়েছে।

অবরোধ আরও দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অন্যদিকে শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা জানান, পর্যটক না আসা এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় জুমচাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারছেন না।

এতে স্থানীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে।

১ নভেম্বর অবরোধ শিথিল করেও মেলেনি স্বস্তি

স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে গত ১ নভেম্বর ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিল করেছিলেন আন্দোলনকারীরা।

কিন্তু একই দিন পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির পাল্টা অবরোধ এবং পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল সম্ভব হয়নি।

ফলে অবরোধ শিথিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও স্থানীয়দের দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ: পুলিশ

সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধের কারণে সড়কে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে কিছু অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

উপসংহার

সাজেকে পাঁচ দফা দাবির চারটিতে সমঝোতার অগ্রগতি হলেও মূল বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। একদিকে পর্যটন ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে খাদ্য, ওষুধ ও যোগাযোগসংকটে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কৃষিপণ্য ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবহণে ছাড় দেওয়া হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দ্রুত সমঝোতা জরুরি হয়ে উঠেছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency