ঠাকুরগাঁও ভূমি অফিসে আবারও ঘুষ–অভিযোগ: স্বাধীনতা পরবর্তী আমল থেকে প্রশাসনিক দুর্নীতির দীর্ঘ ছায়া
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
তারিখ: ৮ আগস্ট ২০২৫
সূত্র: যুগান্তর, মাঠপর্যায়ের তথ্য ও আর্কাইভ বিশ্লেষণ
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর-রায়পুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে আবারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জমির খারিজ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে হয়রানি, সরকারি বিদ্যুৎ চুরি করে ব্যক্তিগত অটোরিকশা চার্জ, এবং সহযোগীর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের একটি চক্র পরিচালনার অভিযোগে স্থানীয়দের ক্ষোভ তীব্র হয়েছে।
এটি নতুন কিছু নয়। এর আগেও ২০২৪ সালের শুরুর দিকে রানীশংকৈল উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় রেজাউল করিমের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করে বর্তমান পদে পাঠানো হয়। কিন্তু বদলি তাকে পরিবর্তন করতে পারেনি — বরং অভিযোগ অনুযায়ী তিনি আরো বেপরোয়া হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আন্না খাওয়া বলেন, “আমার ৮ শতাংশ জমির খারিজ করতে ৭ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল। পরে ভুল ধরা পড়লে সেটি সংশোধনের জন্য তিনি আরো ৪ হাজার টাকা দাবি করেন।”
অন্য একজন ভুক্তভোগী জানান, “সাড়ে ১২ হাজার টাকা দেওয়ার পরও কাগজ হাতে পাইনি, শেষে আরো ৫০০ টাকা দাবি করা হয়।”
এই অভিযোগগুলো বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের রোগেরই প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮০–৯০-এর দশকে স্থানীয় প্রশাসনে ঘুষ–দুর্নীতি নানা সরকারের আমলেই বহাল ছিল।
সম্প্রতি দেখা যায়, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে রেজাউল করিম নিজের ব্যক্তিগত অটোরিকশা চার্জ দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জনগণের টাকায় বিল দেওয়া বিদ্যুৎ তিনি নিজের কাজে ব্যবহার করছেন—এটি সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার।”
এ ধরনের ঘটনা ২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও আলোচিত হয়েছিল, যখন বিদ্যুৎ বিভাগ সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে বহু কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করেছিল।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেজাউল করিম অকপটে জানান, মামুন নামে এক সহযোগীর মাধ্যমে খারিজের আবেদন ও লেনদেন হয়। তার ভাষায়, “আমি টাকার অঙ্ক বলি না। মানুষ যা খুশি দেয়… না নিলে তারা ভাবে কাজ হবে না।”
এই যুক্তি নতুন নয়। ১৯৯০-এর পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, অনেক সরকারি কর্মকর্তা ঘুষকে “চাপের কারণে নেওয়া” বলে দাবি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, রেজাউল করিম ঠাকুরগাঁও শহরের সাহাপাড়ায় পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের একটি বাড়ি নির্মাণ করছেন। দোতলার কাজ শেষ হয়েছে, এছাড়া শহর ও গ্রামে তার আরো বহু সম্পত্তি রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
এমন অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০১২ সালে দুদক–এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, উপজেলা পর্যায়ের তহসিলদারদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের নামে বা বেনামে অস্বাভাবিক সম্পদ রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্নীতির শেকড় পাকিস্তান আমল থেকেই বিস্তার লাভ করে। ১৯৫০-এর দশকে ভূমি সংস্কার আইন কার্যকর হলেও বাস্তবে ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতির আখড়া হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ভূমি প্রশাসন সংস্কারের চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সামরিক শাসনে এ খাত আবারও দুর্নীতির চক্রে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের পরেও একাধিক সরকার ভূমি অফিস ডিজিটালাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি ছিল। ২০২১ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় ই–খারিজ চালু করলেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি কমেনি। ২০২৫ সালের আজকের ঘটনাও সেই দীর্ঘ ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি দায়িত্বের অপব্যবহার করেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”
প্রশাসনিক শাস্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরা।
এই ঘটনা শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তার অনিয়ম নয়, বরং স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর নজরদারি ও দুর্নীতিবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি রোধ করা কঠিন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে—দুর্নীতিবাজদের বদলি করা হয়, কিন্তু তাদের মানসিকতা বদলায় না।
যুগান্তর (প্রকাশিত প্রতিবেদন)
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (দুর্নীতি সূচক প্রতিবেদন, ২০০১–২০২৪)
সরকারি আর্কাইভ ও সংবাদপত্রের তথ্য (১৯৫০–২০২৫)
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |