| বঙ্গাব্দ

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ: 'শুধু গণতন্ত্রে উন্নয়ন সম্ভব নয়'; যুবসমাজ ক্যাডারভিত্তিক জীবিকায় আসক্ত -

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 07-12-2025 ইং
  • 2296808 বার পঠিত
ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ: 'শুধু গণতন্ত্রে উন্নয়ন সম্ভব নয়'; যুবসমাজ ক্যাডারভিত্তিক জীবিকায় আসক্ত -
ছবির ক্যাপশন: ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ

গণতন্ত্র ও উন্নয়ন বিতর্ক: 'শুধু সংস্কার নয়, চাই ব্যক্তিগত-সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন'; ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি ও সুবিধাভোগী বলয়ের উত্থান নিয়ে ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের কঠোর বিশ্লেষণ

প্রতিবেদকের নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

 ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিপথ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক, অর্থাৎ গণতন্ত্র আগে না উন্নয়ন আগে— সেই প্রসঙ্গে স্পষ্ট ও কঠোর বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন পরিকল্পনার উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন যে, "শুধুমাত্র গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।" বরং, রাজনীতি যদি জনকল্যাণমুখী না হয়ে কেবল সুযোগ-সুবিধা ও ব্যক্তিস্বার্থ নির্ভর হয়ে পড়ে, তবে দেশের যুব সমাজ একে ‘ক্যাডারভিত্তিক জীবিকা অর্জনের পথ’ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হবে।

বিআইডিএস-এর বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পর্যটন ভবনে অনুষ্ঠিত দুই দিনের এই সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক প্রফেসর এ.কে. এনামুল হক।

দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্র: একটি অশুভ বলয়

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাজমান কিছু গভীর সমস্যার দিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সবসময়ই একটি সুবিধাভোগী বলয় তৈরি করে জনকল্যাণমুখী নীতি নির্ধারণে বাধা সৃষ্টি করে।

তিনি সতর্ক করে দেন যে, শুধু প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যদি ব্যবসায়ী এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি ‘অশুভ সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে, তবে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না। যেমন, কর ফাঁকি রোধে অনলাইনে কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আনা হলেও, বড় বড় কর ফাঁকি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে হয় না— এর জন্য আরও বড় রাজনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন।

বিশেষ মন্তব্য: "বিধিবিধান বাস্তবসম্মত না হলে আরও বেশি রেন্ট সেকিং বা অবৈধ সুযোগ তৈরি হবে।"

তিনি দেশের দুর্নীতি প্রসঙ্গেও এক চাঞ্চল্যকর সত্য তুলে ধরেন: বাংলাদেশে ঘুষ নেওয়া অপরাধ হলেও দেওয়াটা অপরাধ নয়। কিন্তু কেউ ঘুস দিয়ে প্রকাশ করে না, কারণ উভয়েরই স্বার্থ জড়িত। অবৈধ সম্পদ উপার্জনের চাহিদা রাজনীতিতে থাকলে শুধু বিধিবিধান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এক অনিয়ম বন্ধ করলে অন্য উৎস খুঁজে নেওয়া হবে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন

১৯৫০ থেকে ২০২৫: কার্যকর গণতন্ত্রের সীমিত প্রত্যাশা

ড. মাহমুদ দেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ যাত্রার প্রেক্ষাপটে (১৯৫০-২০২৫) গণতান্ত্রিক অগ্রগতির বিশ্লেষণ করেন। ১৯৫০-এর দশকে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে যে ন্যায্য ভোটাধিকার ও স্বশাসনের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পর দেশ যখন কার্যকর গণতন্ত্রের পথে হাঁটছিল, তখন দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই পথকে কঠিন করে তোলে।

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সরকারের সামনে যে ৩টি লক্ষ্য ছিল, তা তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন:

১. কার্যকর জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটানো। ২. সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। ৩. গুণগত উন্নয়ন, যা ন্যায্য সমাজ, বৈষম্যহীন ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা গঠনে ভূমিকা রাখবে।

তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন সীমিত প্রত্যাশা হলো কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কার্যকর গণতন্ত্রকে সীমিত লক্ষ্য হিসেবে দেখা সত্ত্বেও, তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নতুন দেশে টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের চেষ্টা চলছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বক্তাদের আলোচনা

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ-এর আজকের বক্তব্য (ডিসেম্বর, ২০২৫) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে তুলে ধরল। এই প্রসঙ্গে অতীতের বহু আলোচনা প্রাসঙ্গিক।

  • প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯৭৯): তিনি প্রায়ই তাঁর ভাষণে ‘অর্থনৈতিক মুক্তি’ ও **‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’**র ওপর জোর দিতেন, যা ছিল উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের দ্বৈত লক্ষ্যেরই প্রাথমিক রূপ।

  • শেখ হাসিনা (জুলাই, ১৯৯৬): প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বারংবার সংসদকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেছিলেন যে, “গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন মজবুত না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।”

  • ড. কামাল হোসেন (আগস্ট, ২০০০): তিনি এক সেমিনারে বলেছিলেন, “বিধিবিধান পরিবর্তন নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মূল্যবোধের অভাবই আমাদের দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণ।” (যা ড. মাহমুদের ‘ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন’ বক্তব্যের সাথে মিলে যায়)।

ড. মাহমুদের মতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিপুল সংখ্যক ‘যুব বেকার’ তৈরি করছে এবং এ কারণে শুধু রাজনীতি এককভাবে সব কিছু উন্নত করতে পারবে না। এজন্য আচরণবিধি ও মূল্যবোধ কিভাবে তৈরি হয়, তা নিয়েও গবেষণা করতে হবে।

সমাধান ও করণীয়

পরিকল্পনা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি স্বীকার করেন যে, দ্বৈতভাবে গঠিত সরকারের দ্বৈতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হওয়ায় তাঁর গবেষণার সুযোগ সীমিত। তবুও তিনি জোর দিয়ে বলেন, এতদিন থেকে যে বিষয়গুলো দেখা হয়েছে, তা বদলাতে হবে।

ড. মাহমুদ সুস্পষ্টভাবে বলেন, অবৈধ সম্পদ উপার্জনের চাহিদা বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ন্যায্য ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির বিষয় থাকতে হবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তারিতভাবে থাকার ওপর জোর দেন। তার মতে, পৃথিবীর কোনো দেশ এত গরিব নয় যে সব নাগরিকের চাহিদা মেটাতে পারবে না; তবে এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সঠিক কাঠামো

সম্মেলনের সভাপতি প্রফেসর একেএম এনামুল হক জানান, দুই দিনের গবেষণা সম্মেলনে প্রায় অর্ধশতাধিক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে নানা বিষয় উঠে আসবে, যার মধ্যে যুব বেকার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্য খাতের সংকট অন্যতম।


সূত্র ও বিশ্লেষণ

সূত্র: ১. বিআইডিএস বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশন (পর্যটন ভবন, ঢাকা, ডিসেম্বর, ২০২৫)। ২. বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের আর্কাইভস থেকে সংগৃহীত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বক্তব্য। ৩. রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সেমিনার রিপোর্ট (২০০০)।

বিশ্লেষণ প্রতিবেদন কারির নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

বিশ্লেষণ: ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুকে স্পর্শ করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে যেয়ে গণতন্ত্রের মানকে সীমিত করায় যে সুবিধাভোগী বলয় সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের যুব সমাজকে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে আকৃষ্ট করছে। তার এই পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক ইতিহাসে (১৯৫০-২০২৫) গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল— অর্থাৎ জনকল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের পরিপন্থী। ড. মাহমুদ একক প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যর্থতা তুলে ধরে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি ন্যায্য সমাজ গঠনের ওপর যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency