প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সময় যা ছিল অকল্পনীয়, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাই বাস্তবে রূপ নিল। দীর্ঘ কারাবাস, প্রহসনের বিচার আর মাথায় ঝোলা ফাঁসির দড়ি উপেক্ষা করে এক সময়ের 'কারাবন্দি' নেতারা এখন জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নাটকীয় মোড় আসে, তার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেল এবারের নির্বাচনী ফলাফলে।
২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০০৭ সাল থেকে কারাবন্দি ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। দীর্ঘ ১৮ বছর তাকে রাখা হয়েছিল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বদলে যায় দৃশ্যপট। ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি আইনি প্রক্রিয়ায় সব মামলা থেকে খালাস পেয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
মুক্তির পর বাবর ফিরে যান তার প্রিয় নির্বাচনি এলাকা নেত্রকোনায় (মোহনগঞ্জ-মদন-খলিয়াজুরি)। ধানের শীষ প্রতীকে অংশ নিয়ে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হওয়ার সময় বাবর বলেন, "জনগণই সকল শক্তির উৎস, তারা আজ আমাকে যে সম্মান দিয়েছে তা আমি সেবার মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে চাই।"
বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুর গল্পটিও অনেকটা একই রকম। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় দীর্ঘ ১৭ বছর কারাবন্দি থাকার পর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান। নিজ জন্মস্থান টাঙ্গাইলের গোপালপুর-ভূঞাপুর আসনে ধানের শীষ হাতে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। নির্বাচনে প্রায় ২ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন এলাকার মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিজয়গুলোর একটি হলো জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের। কথিত 'মানবতাবিরোধী অপরাধের' মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই নেতা ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘ এক যুগ বন্দি ছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ মে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। রংপুর-২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে তিনি বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফাঁসির দড়ি থেকে ফিরে আসার পর তার এই বিজয়কে কর্মী-সমর্থকরা ‘ন্যায়বিচারের বিজয়’ হিসেবে দেখছেন।
বাংলার রাজনীতি গত ১২৫ বছরে নানা বাঁকবদল দেখেছে। ১৯০০ সালের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ—সবই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই। তবে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বলা হচ্ছে 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা'। অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবার দুটি বিষয়ে শপথ নেবেন—একটি হলো সংবিধান রক্ষা এবং অন্যটি হলো 'জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা' বাস্তবায়ন করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পর্যবেক্ষক মিশন এবারের নির্বাচনকে 'গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর সেই রাজনৈতিক সূচনা থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এই অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
এবারের সংসদে একদিকে যেমন রয়েছেন অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতারা, অন্যদিকে রয়েছেন একঝাঁক তরুণ মুখ। স্বাধীনতার পর এই প্রথম অনেক আসনে নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ড. ওসমান ফারুকের মতো প্রবীণ নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তরুণ নেতাদের ফুল ও মিষ্টি দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর দৃশ্যটি একটি সুস্থ ধারার রাজনীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: নির্বাচন কমিশন ফলাফল বিবরণী (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), যুগান্তর আর্কাইভ, বাসস, এবং ড. আলী রীয়াজের বক্তব্য।
বিশ্লেষণ: এই প্রতিবেদনে তিনজন শীর্ষ নেতার কারাজীবন থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার যাত্রাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর তাদের এই ফিরে আসা এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করা প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী সরকারের বিচারিক প্রক্রিয়া জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি রায়।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |