প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিশাল জয় দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ১০ কোটিরও বেশি মানুষের এই সীমান্ত রাজ্যে প্রথমবারের মতো বিজেপি ক্ষমতা দখল করেছে, যা ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০-তে। বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে 'মুসলিম তোষণকারী' হিসেবে চিত্রায়িত করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার মাধ্যমে হিন্দুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা বিজেপির এই বিজয়ের অন্যতম চাবিকাঠি ছিল।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল নির্বাচন কমিশনের 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (এসআইআর) কার্যক্রম।
নকল ও অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়ার নামে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৯০ লাখ নাম এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে যে, মুসলিম, অভিবাসী শ্রমিক এবং দরিদ্র ভোটারদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বাংলায় প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়ে।
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজেপির জয়ী হওয়া অনেক আসনেই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি।
বিজেপি মোট ভোট পেয়েছে ২,৯২,২৪,৮০৪টি, যা তৃণমূলের চেয়ে ৩২,১১,৪২৭টি বেশি।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের ওপরই তাদের ভোটাধিকার প্রমাণের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চুক্তির একটি বিপজ্জনক লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিবাসী শ্রমিকরা স্বল্প সময়ের মধ্যে নথিপত্র সংগ্রহ করে ভোটাধিকার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া এআই-চালিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে নামের বানানের অসংগতি খুঁজে বের করে মুসলিমদের নাম বেশি করে 'ফ্ল্যাগ' বা চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে।
ভারতের এই নির্বাচনী বিকৃতি এবং ভোটাধিকার সংকটের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের মানুষের সংগ্রাম মূলত ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও দেশভাগ (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ—উভয় ঘটনাই ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে ঘটেছিল, যা আজও বাংলার রাজনীতিতে ছায়া ফেলে যাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনা (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল মূলত মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক। একটি সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী গণরাদেশকে যখন অস্বীকার করা হয়েছিল, তখনই এদেশের মানুষ সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
গণতন্ত্রের চড়াই-উতরাই ও ২০২৪-এর বিপ্লব: ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লব—প্রতিটি আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালের বর্তমান সংস্কারমুখী বাংলাদেশ এখন একটি স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা প্রতিবেশী ভারতের বর্তমান অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ভারতের সাম্প্রতিক এই 'ইলেকটোরাল ইঞ্জিনিয়ারিং' ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোকে স্থায়ীভাবে বদলে একদলীয় ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা চলছে। ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম উধাও হওয়া এবং আপিল অমীমাংসিত থাকা মূলত 'গণ-ভোটাধিকার হরণ'-এর শামিল। ১৯০০ সালের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে ২০২৬ সালের আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কার—বাংলার দুই প্রান্তেই গণতন্ত্র এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন।
সূত্র: ১. প্রদত্ত নিবন্ধ (দিল্লিভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিকের বিশ্লেষণ)। ২. ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ। ৩. ঐতিহাসিক দলিল: বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশের ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
ওয়েবসাইট:
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |