প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ইরানি হামলার জবাবে প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরব ও কাতারসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় আবুধাবি চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ। ব্লুমবার্গ নিউজের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে, তার প্রেক্ষাপটে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) একটি আঞ্চলিক সামরিক ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেন। তবে তাঁর এই প্রচেষ্টা বড় ধরণের বাধার মুখে পড়ে:
রিয়াদ ও দোহার অবস্থান: সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং কাতারের আমির স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, এই যুদ্ধে তাঁরা সরাসরি জড়াতে চান না। তাঁদের মতে, এটি ‘আবুধাবির যুদ্ধ’, পুরো অঞ্চলের নয়।
জিসিসি-র প্রাসঙ্গিকতা: এমবিজে ১৯৮১ সালে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) গঠনের মূল উদ্দেশ্য—ইরানের হুমকি মোকাবিলার কথা মনে করিয়ে দিলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর মন গলেনি।
আমিরাতের একলা চলো নীতি: সমর্থন না পেয়ে গত এপ্রিলের শেষে আবুধাবি ঐতিহাসিকভাবে ওপেকের (OPEC) সদস্যপদ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করে।
ইরান ও আমিরাতের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে:
জ্বালানি সংকট: হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাস উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি: ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কাতারের রাস লাফান এলএনজি প্ল্যান্টে বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। আমিরাতের ফুজিরাহ তেল বন্দরও নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে।
সীমিত সামরিক পদক্ষেপ: জিসিসি-র সমর্থন ছাড়াই মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরান লক্ষ্য করে সীমিত আকারে নিজস্ব হামলা চালিয়েছে আবুধাবি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর এই বর্তমান দ্বন্দ্ব ও সামরিক মেরুকরণ ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও ব্রিটিশ প্রভাব (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে বর্তমানের সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল না। তখন এই অঞ্চলটি ছোট ছোট গোত্র ও ব্রিটিশ প্রভাব বলয়ে বিভক্ত ছিল। ১৯০০ সালের সেই মুক্তো আহরণকারী মৎস্যজীবীদের গ্রাম থেকে ২০২৬ সালের এই পারমাণবিক ও ড্রোন যুদ্ধের প্রযুক্তিতে রূপান্তর বিশ্ব ইতিহাসের এক বিস্ময়।
ইসলামিক বিপ্লব ও জিসিসি (১৯৭৯-১৯৮১): ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর রাজতান্ত্রিক দেশগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ১৯৮১ সালে জিসিসি গঠন করে। ১৯০০ সালের পর থেকে এই প্রথম আরব দেশগুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক জোট গঠন করেছিল, যা ২০২৬ সালে এসে বড় ধরণের ফাটলের মুখে পড়েছে।
অব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও ২০২৪-এর বিপ্লব: ২০২০ সালে ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক স্থাপন (অব্রাহাম অ্যাকর্ডস) এই অঞ্চলের সমীকরণ বদলে দেয়। ২০২৪ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ এবং ২০২৬ সালের ট্রাম্প প্রশাসনের সক্রিয়তা আমিরাতকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছে।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের সেই উটের কাফেলার আমল থেকে ২০২৬ সালের এই অত্যাধুনিক ‘এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’-এর যুগে পৌঁছেও আরবরা একতাবদ্ধ হতে পারছে না। সৌদি ও আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন প্রকাশ্য সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য সবসময়ই বাইরের শক্তিগুলোকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে। ১৯০০ সালের সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল প্রক্সি ওয়ার পর্যন্ত—আরব রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় স্বার্থ সবসময়ই তাদের ধর্মীয় বা আঞ্চলিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপেকের মতো শক্তিশালী জোট ত্যাগ এবং জিসিসি থেকে বের হওয়ার চিন্তাভাবনা প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালের এই মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য এক নতুন এবং অনিশ্চিত মানচিত্রের দিকে এগোচ্ছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও আমিরাতের একলা চলার জেদ এই অঞ্চলের স্থায়িত্বের জন্য এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
সূত্র: ১. ব্লুমবার্গ নিউজের বিশেষ প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য (মে ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও জিসিসি-র বিবর্তন (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |