আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় একটি ভঙ্গুর ও আপেক্ষিক যুদ্ধবিরতি চললেও, গাজা সিটিতে এক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালিয়ে হামাসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী সামরিক নেতা ইজ্জ আল-দিন আল-হাদাদ-কে হত্যা করেছে ইসরাইল। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা সংস্থার (আইএসএ) পক্ষ থেকে দেওয়া একটি যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) বিকালের এই হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত সাতজন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে গাজার জরুরি পরিষেবা বিভাগ জানিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পরবর্তীতে স্পষ্ট করে যে, একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত হামলার’ মাধ্যমে আল-হাদাদকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। রয়টার্স জানায়, শনিবার (১৬ মে) উত্তর গাজার মসজিদগুলো থেকেও আল-হাদাদের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়েছে, তবে হামাসের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
গাজার জরুরি পরিষেবা ও চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই রক্তক্ষয়ী হামলার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছে:
দ্বিমুখী বিমান হামলা: শুক্রবার বিকেলে গাজা সিটির আল-রিমাল এলাকার একটি আবাসিক ভবনে প্রথম হামলাটি চালানো হয় এবং এর পরপরই কাছাকাছি একটি রাস্তায় থাকা একটি গাড়ি লক্ষ্য করে দ্বিতীয় বিমান হামলাটি করা হয়।
হতাহতের চিত্র: গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া সিএনএনকে জানিয়েছেন, নিহত সাতজনের মধ্যে তিন নারী ও একটি শিশুর মরদেহ তাঁরা হাসপাতালে পেয়েছেন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্যারামেডিকরা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০ জন আহত রোগীকে উদ্ধার করে আল-সারায়া ফিল্ড হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
রহস্যময় স্বভাব এবং অত্যন্ত গোপনে চলাফেরা করার কারণে হামাসের ভেতরে ‘আল-কাসামের ভূত’ নামে পরিচিত ছিলেন ইজ্জ আল-দিন আল-হাদাদ। তিনি হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জ আল-দিন আল-কাসাম ব্রিগেডের প্রধান ছিলেন।
ইসরাইলি অভিযানে হামাসের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার, তাঁর ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ার এবং মোহাম্মদ দেইফ নিহত হওয়ার পর, আল-হাদাদকেই সংগঠনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ও প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইসরাইলের পক্ষ থেকে আল-হাদাদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নজিরবিহীন হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী এবং পরবর্তীতে জিম্মিদের আটকে রাখার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং গাজা উপত্যকাকে সামরিক মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন চুক্তি বাস্তবায়নে অস্বীকৃতি জানানোর জন্যও তাকে দায়ী করেছে ইসরাইল।
‘আল-কাসামের ভূত’ খ্যাত শীর্ষ নেতার এই হত্যাকাণ্ড এবং গাজার বর্তমান পরিস্থিতি ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ রাজনীতির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও বেলফোর ঘোষণা (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে গাজা এবং সামগ্রিক ফিলিস্তিন অঞ্চলটি অটোমান (উসমানীয়) সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, যেখানে মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা আপেক্ষিক শান্তিতে বসবাস করত। ১৯০০ সালের সেই শান্ত অবয়বটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এবং বিশেষ করে ১৯১৭ সালের ব্রিটিশদের ‘বেলফোর ঘোষণা’র পর সম্পূর্ণ বদলে যায়, যা এই ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে এবং আরব-ইসরাইল চিরস্থায়ী সংকটের জন্ম দেয়।
হামাসের উত্থান ও প্রথম সারির নেতাদের হত্যাকাণ্ড (১৯৮৭-২০২৪): ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদার সময় হামাসের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শেখ আহমেদ ইয়াসিন, আব্দুল আজিজ আল-রান্তিসি থেকে শুরু করে অতি সম্প্রতি ইসমাইল হানিয়াহ ও ইয়াহিয়া সিনওয়ারের মতো শীর্ষ নেতাদের টার্গেটেড কিলিং বা গুপ্তহত্যার মাধ্যমে নির্মূল করার কৌশল নিয়ে আসছে ইসরাইল। ১৯০০ সালের প্রথাগত লড়াই থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে এই যুদ্ধ ড্রোন ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তি ও ২০২৬-এর ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি: ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর ধারাবাহিকতায় হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে গাজার শাসনক্ষমতা থেকে সরানোর একটি রূপরেখা তৈরি করে। গত বছরের (২০২৫) অক্টোবর থেকে গাজায় মার্কিন মধ্যস্থতায় দৃশ্যত একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইল নিয়মিতভাবেই সেখানে হামলা চালিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য-অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় গাজায় ৮৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের সেই অটোমান যুগের সাধারণ রাইফেল আর ঘোড়ার গাড়ির আমল থেকে ২০ Anglican২৬ সালের এই ভূগর্ভস্থ টানেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত গোয়েন্দা নজরদারির যুগে এসেও গাজার রক্তক্ষয় থামেনি। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার সাবেক বিশেষ সমন্বয়কারী নিকোলে ম্লাদেনভ স্বীকার করেছেন যে, এই যুদ্ধবিরতিটি ‘ত্রুটিমুক্ত নয়’। ইসরাইলের দাবি, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার সম্ভব নয়, যা ২০২৬ সালের মে মাসের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো প্রতিরোধ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে সেই আদর্শ বা সংগঠনকে পুরোপুরি স্তব্ধ করা যায় না। ১৯০০ সালের সেই পরাধীন ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ থেকে ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুদ্ধ—নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও লড়াইয়ের মূল মনস্তত্ত্ব একই রয়ে গেছে। ইয়াহিয়া সিনওয়ার বা মোহাম্মদ দেইফের পর ইজ্জ আল-দিন আল-হাদাদের এই প্রস্থান হামাসের সামরিক কাঠামোতে বড় ধাক্কা দিলেও, এই ধরণের হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ড গাজায় স্থায়ী শান্তির পথকে আরও কঠিন করে তোলে। মার্কিন মধ্যস্থতায় চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এই ঘটনার পর টিকে থাকবে কিনা, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বারুদের আগুন জ্বলবে—তা ২০২৬ সালের এই মে মাসের ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
সূত্র: ১. ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও আইএসএ-এর যৌথ বিবৃতি এবং গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতাল ও সিএনএন-এর বিশেষ প্রতিবেদন (১৬ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে ফিলিস্তিন সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে টার্গেটেড কিলিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |