মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬: বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে হুশিয়ারি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক (World Bank)। টানা তিন বছর ধরে মন্থর প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির অব্যাহত ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদী নিম্নমুখিতার কারণে এই নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, এই সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে কঠোর কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে অনতিবিলম্বে কিছু কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সোমবার বিশ্বব্যাংক এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (PRI) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: স্পেশাল ফোকাস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। পিআরআই-এর সভাপতি ড. জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের অর্থনীতির এই ঐতিহাসিক বিচ্যুতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সেই সোনালী ধারা থেকে একটি বড় বিচ্যুতি নির্দেশ করছে:
মন্দার ধারাবাহিকতা: চড়া মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা টানা তৃতীয় বছরের মতো অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিফলন।
দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি: ২০১৮ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮.৭ শতাংশে ছিল, অব্যাহত অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ২০২৫ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২১.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগে ঐতিহাসিক ধস: সেমিনারে আলোচকদের মতে, দেশের ইতিহাসে গত ৩৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন এবং অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ) এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা—উভয়ই সমানভাবে দায়ী:
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বহুমুখী আঘাত: চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও ঘনীভূত করেছে।
প্রকৃত আয় হ্রাস ও নতুন দরিদ্রের সংখ্যা: উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে থাকায় নিম্ন আয়ের ও অদক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত আয় নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই মন্দার ফলে দেশে নতুন করে আরও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের সীমার নিচে নেমে যাবে।
ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশা ও খেলাপি ঋণ: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের (Loan Classification) আন্তর্জাতিক মান কঠোর করায় এবং কয়েকটি ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগের ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ (NPL) ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ব্যাংকের তারল্য ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
সর্বনিম্ন রাজস্ব আদায়: দেশের রাজস্ব আদায় (Tax-to-GDP Ratio) বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। রাজস্ব আয় দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
+------------------------------------------+------------------------------------+
| অর্থনৈতিক সূচক ও খাত | ঐতিহাসিক ডাটা ও বর্তমান চিত্র (২০২৬)|
+------------------------------------------+------------------------------------+
| প্রক্ষেপিত জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি | ৩.৯% (টানা ৩ বছর মন্থর গতি) |
| বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ | গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর |
| দারিদ্র্যের হার (২০১৮ বনাম ২০২৫) | ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২১.৪% এ উন্নীত |
| নতুন দারিদ্র্যের আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস | আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে|
| রাজস্ব আদায় (Tax-to-GDP) | বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেকর্ড |
+------------------------------------------+------------------------------------+
অর্থনৈতিক এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সেমিনারে বক্তারা এবং বিশ্বব্যাংক কয়েকটি জরুরি কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন:
১. ব্যাংক খাতের সুশাসন: জরুরি ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোতে মূলধনের জোগান বাড়াতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে খেলাপি ঋণ দ্রুত কমাতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি বা সুশাসন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ২. সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও দুর্নীতি রোধ: শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়; পণ্যের কৃত্রিম সংকট দূর করতে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা, দুর্নীতি রোধ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল করা আবশ্যক। ৩. রাজস্ব নীতি সংস্কার: কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে হবে, যেন সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো যায়।
প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য নীতি এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন সংস্থার প্রতিবেদন সংক্রান্ত গভীর ও প্রফেশনাল ইনফরমেশনাল কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন বাংলাদেশ প্রতিদিন ওয়েবসাইটে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |