| বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে ৩ বছরের জন্য বৈধ অভিবাসন স্থগিতের প্রস্তাব: প্রবাসীদের মনে তীব্র উদ্বেগ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-05-2026 ইং
  • 14933 বার পঠিত
ফ্রান্সে ৩ বছরের জন্য বৈধ অভিবাসন স্থগিতের প্রস্তাব: প্রবাসীদের মনে তীব্র উদ্বেগ
ছবির ক্যাপশন: ফ্রান্সে ৩ বছরের জন্য বৈধ অভিবাসন স্থগিতের প্রস্তাব

ফ্রান্সে বড় ধরণের অভিবাসন নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত: ৩ বছরের জন্য বৈধ অভিবাসন স্থগিতের প্রস্তাবে প্রবাসীদের উদ্বেগ

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য ফ্রান্সে বৈধ অভিবাসন নীতিতে বড় ধরণের কড়াকড়ি ও পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ ফ্রান্সে বৈধ অভিবাসন সাময়িকভাবে আগামী তিন বছরের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছেন। ফরাসি সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই প্রস্তাবের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ফরাসি জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘জার্নাল দু দিমঁশ’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিচারমন্ত্রী দারমানাঁ বলেন, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি এবং বর্তমান সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতেই বৈধ অভিবাসনে সাময়িক বিরতি বা ‘পজ’ ($Pause$) দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। পরবর্তীতে ল্য প্যারিজিয়েন এবং আরটিএল ফ্রান্সসহ একাধিক মূলধারার ফরাসি গণমাধ্যমে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়।

১. কাজের ভিসা ও ফ্যামিলি রিইউনিয়ন বা পারিবারিক পুনর্মিলন ঝুঁকির মুখে

বিচারমন্ত্রী তাঁর সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই নতুন প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত ফরাসি আইনসভায় পাস হয়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে ফ্রান্সে কাজের ভিসা (Work Visa) এবং পারিবারিক পুনর্মিলনের (Family Reunification) মতো নিয়মিত ও আইনি অভিবাসন প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

এতে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা, যারা নিজেদের পরিবার ও সন্তানদের ফ্রান্সে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্যারিস এবং এর আশেপাশের এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রবাসীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফ্রান্সে নতুন ভিসা ইস্যু এবং রেসিডেন্স পারমিট বা আবাসন (Titre de Séjour) প্রক্রিয়ায় অলিখিত কড়াকড়ি অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ আবাসন নবায়ন, জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং সাক্ষাৎকার (Interview) নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত বা কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা ও দেশ থেকে বহিষ্কারের কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে।

ফ্রান্সে প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতি ও প্রবাসীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

ফ্রান্সের প্রস্তাবিত ও সাম্প্রতিক কার্যকর হওয়া অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ফলে প্রবাসীদের জন্য রেসিডেন্স পারমিট ও নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অজুহাতে ফরাসি সরকার আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। 
প্রস্তাবিত ও নতুন কার্যকর হওয়া নীতিমালার মূল বিষয় এবং প্রবাসীদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ৩ বছর বৈধ অভিবাসন বন্ধের বিতর্কিত প্রস্তাব
সম্প্রতি ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতির স্বার্থে বৈধ অভিবাসন সাময়িকভাবে ৩ বছরের জন্য স্থগিত রাখার একটি প্রস্তাব পেশ করেছেন। 
  • প্রভাব: এই প্রস্তাবটি যদি চূড়ান্তভাবে পাস হয়, তবে নতুনদের কাজের ভিসা (ওয়ার্ক পারমিট) এবং ফ্যামিলি রিইউনিয়নের (পরিবার নিয়ে আসার সুযোগ) মতো আইনি পথগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এটি প্রবাসীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। 
২. ভাষা ও নাগরিকত্বের কঠোর নিয়ম (২০২৬ থেকে কার্যকর) 
২০২৬ সাল থেকে বহুবছর মেয়াদী রেসিডেন্স পারমিট এবং নাগরিকত্ব আবেদনের জন্য ফরাসি ভাষার দক্ষতার স্তর বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 
  • মাল্টি-ইয়ার রেসিডেন্স কার্ড: এখন ন্যূনতম A2 লেভেল ফরাসি ভাষা জানা আবশ্যক।
  • ১০ বছর মেয়াদী রেসিডেন্স কার্ড: আবেদনের জন্য B1 লেভেল ভাষা দক্ষতা লাগবে।
  • ফরাসি নাগরিকত্ব (Citizenship): ফরাসি পাসপোর্টের জন্য ভাষা দক্ষতার যোগ্যতা বাড়িয়ে B2 লেভেল করা হয়েছে। 
৩. বাধ্যতামূলক ডিজিটাল 'সিভিক এক্সাম'
প্রথমবার মাল্টি-ইয়ার কার্ড, ১০ বছরের কার্ড বা নাগরিকত্বের আবেদনকারীদের জন্য একটি নতুন ডিজিটাল সিভিক এক্সাম (Civic Exam) বা বহু নির্বাচনী পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 
  • প্রভাব: ফরাসি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ওপর তৈরি এই ৪০টি প্রশ্নের পরীক্ষায় ৮০% নম্বর পেয়ে পাস করতে হবে। এতে অনুত্তীর্ণ হলে কার্ড পাওয়া যাবে না।
৪. রেসিডেন্স পারমিট ও নাগরিকত্ব ফি বৃদ্ধি (মে ২০২৬ থেকে কার্যকর)
২০২৬ সালের মে মাস থেকে নতুন অর্থ আইনের অধীনে প্রবাসীদের জন্য সব ধরনের প্রশাসনিক ফি বা ট্যাক্স স্ট্যাম্পের (Fiscal Stamps) খরচ ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। 
  • প্রথমবার রেসিডেন্স কার্ড: ফি ২২৫ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ ইউরো করা হয়েছে।
  • কার্ড নবায়ন (Renewal): সাধারণ নবায়ন ফি বাড়িয়ে এখন ২৫০ ইউরো করা হয়েছে।
  • নাগরিত্ব আবেদন ফি: নাগরিকত্বের আবেদন ফি ৫৫ ইউরো থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২৫৫ ইউরো করা হয়েছে।
  • শিক্ষার্থী ও কর্মী: স্টুডেন্ট ও ফ্যামিলি ভিসার বিশেষ ছাড়ের ফি-ও ৭৫ ইউরো থেকে বাড়িয়ে ১৫০ ইউরো করা হয়েছে। 
৫. রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) ও অনিয়মিত অভিবাসী নিয়ন্ত্রণ 
ফ্রান্সের বর্তমান ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। 
  • প্রশাসনিক আটক ও বহিষ্কার: গুরুতর অপরাধে জড়িত অনিয়মিত প্রবাসীদের বহিষ্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে (CRA) রাখার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া, সীমান্তে ফিল্টারিং ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
  • আশ্রয় আবেদন: রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের নতুন আবেদনকারীদের ফাইল বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। 
৬. 'ম্যাটিয়ের্স এন তেনসিওন' (শ্রম সংকটের পেশা) ও ভালো দিক
সব কড়াকড়ির মাঝেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেসব পেশায় ফ্রান্সে তীব্র কর্মী সংকট রয়েছে (যেমন- নির্মাণ কাজ, স্বাস্থ্যখাত, কাঠমিস্ত্রি), সেগুলোতে নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই কর্মীরা সরাসরি বৈধতার আবেদন করতে পারবেন। এই বিশেষ সুযোগটি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। 
প্রবাসীদের জন্য করণীয়:
১. ভাষা শিক্ষা: ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চাইলে অবিলম্বে ফরাসি ভাষা ভালোভাবে (ন্যূনতম A2 বা B1 লেভেল) আয়ত্ত করুন।
২. নথিপত্র গুছিয়ে রাখা: রেসিডেন্স পারমিট নবায়নের জন্য নিয়মিত ট্যাক্স রিটার্ন ও ইউটিলিটি বিলের কপি সংরক্ষণ করুন। সরকার নবায়নের প্রশাসনিক সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
৩. আর্থিক প্রস্তুতি: সরকারি ফি বৃদ্ধির কারণে আবেদন বা নবায়নের সময় অতিরিক্ত ইউরো সাথে রাখুন। 

২. ফরাসি প্রবাসে বাংলাদেশিদের বাস্তব চিত্র ও প্রতিক্রিয়া

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা এই রাজনৈতিক প্রস্তাবে গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন:

  • প্যারিস (লা শাপেল): লা শাপেলে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, তাঁর স্ত্রীর পারিবারিক পুনর্মিলনের (ফ্যামিলি ফাইল) ফাইলটি দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি ইমিগ্রেশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন এই স্থগিতাদেশের খবরের পর পরিবারে মানসিক দুশ্চিন্তা ও হতাশা আরও বেড়েছে।

  • সেন-দেনি: সেন-দেনিতে বসবাসরত আব্দুল কাদের বলেন, ফ্রান্সে আগে থেকেই প্রশাসনিক ফাইলের গতি অত্যন্ত ধীর ছিল। এখন যদি এই নতুন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তবে অপেক্ষার সময়সীমা আরও কয়েক বছর বেড়ে যেতে পারে।

  • লিওন: লিওন শহরে বসবাসরত নাজমুল ইসলাম জানান, অনেক বাংলাদেশি ভাই ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে থিতু হয়ে পরিবার আনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন, কিন্তু আকস্মিক এই নতুন পরিস্থিতিতে সবাই এখন দিশেহারা।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং বৈশ্বিক পলিসি ওয়াচার হিসেবে আমি দেখেছি যে, ইউরোপের রাজনীতিতে এখন অভিবাসন বিরোধী হাওয়া বেশ প্রবল। ফ্রান্সে বিচারমন্ত্রীর এই প্রস্তাবটি মূলত আগামী ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটি অংশ। তবে আইন হিসেবে পাস হওয়ার আগে এটি নিয়ে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে প্রবাসীদের ধৈর্য ধরে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।

৩. এটি কি এখনই আইন? বিশ্লেষকদের মতামত ও ভবিষ্যৎ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসীদের জন্য স্বস্তির বিষয় হলো—এটি এ মুহূর্তে কোনো পাস হওয়া আইন নয়, বরং একটি প্রাথমিক রাজনৈতিক প্রস্তাব মাত্র। এটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে ফরাসি পার্লামেন্টে দীর্ঘ আলোচনা, প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন এবং বেশ কিছু জটিল সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসে দেশটির আইনসভায় এ বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্ক অনেক দূর এগোলেও, ২০২৬ সালের শেষভাগের আগে বড় কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত সরাসরি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে ২০২৭ সালের ফ্রান্সের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অভিবাসন ইস্যুটি যে ফরাসি রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে, তা নিশ্চিত। আর এই রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির খেসারত দিতে হচ্ছে ফ্রান্সে বসবাসরত সাধারণ অভিবাসী পরিবারগুলোকে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency