| বঙ্গাব্দ

কাবার ভেতরটা কেমন এবং বাইরের গিলাফ কিসওয়াহ তৈরির অজানা ইতিহাস ও খরচ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-05-2026 ইং
  • 14681 বার পঠিত
কাবার ভেতরটা কেমন এবং বাইরের গিলাফ কিসওয়াহ তৈরির অজানা ইতিহাস ও খরচ
ছবির ক্যাপশন: কাবা

কাবার ভেতরটা কেমন এবং চারপাশের সোনালী গিলাফ 'কিসওয়াহ' তৈরির অজানা ইতিহাস ও ব্যয়

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: বিশ্ব মুসলিমের হৃদস্পন্দন পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে মক্কা নগরীতে শুরু হয়েছে বার্ষিক পবিত্র হজ উৎসব। লাখো কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। প্রতিবছর হজের সময় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মুসলিম কাবার চারদিকে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে সাতবার প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ করে হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। দূর থেকে কাবার যে নয়নকাড়া কালো অবয়ব চতুষ্পার্শ্বকে মোহিত করে, তা মূলত খাঁটি রেশম এবং সোনা-রুপার সুতোয় বোনা একটি বিশেষ চাদর, যার নাম কিসওয়াহ (Kiswah)

পবিত্র কাবা শরিফ হলো ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান, যা মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। আরবি শব্দ ‘কাবা’র অর্থ ঘনক। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকেই মুসলিমরা এই কাবার দিকে মুখ করে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন, যা কিবলা নামে পরিচিত। কাবার কাঠামোগত পরিমাপ অনুযায়ী এটি উচ্চতায় প্রায় ১৩.১ মিটার, দৈর্ঘ্যে ১২.৮ মিটার এবং প্রস্থে ১১.০৩ মিটার।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইতিহাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে আদি পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) এই পবিত্র ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবা প্রাঙ্গণকে মূর্তিমুক্ত করে একত্ববাদী ইবাদতের মূল কেন্দ্রে রূপান্তর করেন।

১. কাবার ভেতরটা কেমন? জাঁকজমক নাকি সাদামাটা?

বাইরে থেকে কাবা শরিফের জাঁকজমক ও আকর্ষণীয় দৃশ্য চোখে পড়লেও এর ভেতরের অংশটি অত্যন্ত সাদামাটা ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ।

  • স্বর্ণনির্মিত প্রবেশদ্বার: কাবার উত্তর-পূর্ব দিকে মাটির চেয়ে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে একটি রাজকীয় স্বর্ণনির্মিত প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি এই দরজাটির উচ্চতা ৩.১ মিটার এবং প্রস্থ ১.৯ মিটার। বছরে সাধারণত দুবার বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কাবার অভ্যন্তরীণ ভাগ ধৌত করার জন্য এই দরজাটি খোলা হয়।

  • অভ্যন্তরীণ কাঠামো: কাবার ভেতরে রয়েছে ছাদকে মজবুতভাবে ধরে রাখা তিনটি প্রাচীন কাঠের স্তম্ভ এবং ছাদে ওঠার জন্য একটি বিশেষ সিঁড়ি। কাবার মেঝে এবং চারপাশের দেয়ালগুলো শ্বেত মার্বেল পাথরে মোড়ানো এবং সিলিং থেকে ঝুলছে সুদৃশ্য সব প্রাচীন লণ্ঠন। কাবার ভেতরের দেয়ালগুলো ঐতিহ্যগতভাবে লাল, সবুজ বা গাঢ় নীল রঙের জিগ-জ্যাগ নকশার কাপড়ে ঢাকা থাকে।

২. পবিত্র গিলাফ বা ‘কিসওয়াহ’র খুঁটিনাটি ও নামকরণ

কাবার বাইরের অংশকে আবৃত করে রাখা এই কালো রেশমি কাপড়ের নামকরণ হয়েছে আরবি শব্দ ‘কাসা’ থেকে, যার অর্থ ঢেকে রাখা বা চাদর জড়ানো। হজের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় এবং স্পর্শ থেকে সুরক্ষার জন্য এই গিলাফের নিচের অংশটি কিছুটা ওপরে গুটিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে রাখা হয়।

কিসওয়াহর মূল অংশটি তৈরি হয় ৪৭টি খণ্ডে বিভক্ত ১৪ মিটার উঁচু রেশমি কাপড় দিয়ে। এর ওপরের দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে প্রায় ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ৪৭ মিটার দীর্ঘ একটি স্বর্ণখচিত বেল্ট বা ‘হিজাম’। আর কাবার দরজার ওপর ঝোলানো বিশেষ পর্দাটিকে বলা হয় ‘সিতারা’ বা ‘বুরকু’, যা কিসওয়াহর সবচেয়ে অলংকৃত ও আকর্ষণীয় অংশ।

কাবার গিলাফ (কিসওয়াহ) তৈরির উপাদান ও খরচ ম্যাট্রিক্স

পবিত্র কাবার চারপাশ আবৃত করে রাখা কালো রেশমি কাপড় বা 'কিসওয়াহ' (Kiswa) বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও মর্যাদাপূর্ণ বস্ত্রখণ্ড হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর মক্কার বিশেষায়িত কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর ম্যানুফ্যাকচারিং দ্য কাবা কিসওয়া কারখানায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই গিলাফ তৈরি করা হয়. এতে উচ্চমানের প্রাকৃতিক ইতালীয় রেশম এবং জার্মানি থেকে আমদানিকৃত সোনা ও রুপার খাঁটি সুতা ব্যবহার করা হয়. 
কাবার গিলাফ তৈরির প্রধান উপাদান, পরিমাপ এবং খরচের একটি বিস্তারিত পরিবর্তন ও পরিসংখ্যানগত ম্যাট্রিক্স নিচে দেওয়া হলো:
কাবার গিলাফের উপাদান ও খরচ ম্যাট্রিক্স
ক্যাটাগরি সুনির্দিষ্ট উপাদান / পরিমাপপরিমাণ / ওজনতাৎপর্য ও বিবরণ
মূল কাপড়প্রাকৃতিক কাঁচা রেশম (Silk)৬৭০ - ৭০০ কেজিইতালি থেকে আমদানিকৃত এই প্রিমিয়াম রেশমকে ধুয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করার পর বাইরে কালো এবং ভেতরে সবুজ রঙে রাঙানো হয়.
ক্যালিগ্রাফি সুতাখাঁটি সোনার সুতা (Gold Thread)১২০ কেজি২১ ক্যারেটের এই খাঁটি সোনার সুতা দিয়ে গিলাফের ওপর কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং আল্লাহর নাম এমব্রয়ডারি করা হয়.
ক্যালিগ্রাফি সুতাখাঁটি রুপার সুতা (Silver Thread)১০০ কেজিক্যালিগ্রাফির নিচের অংশে রূপালী সুতা দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তুলে তার ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়.
আয়তন ও দৈর্ঘ্যমোট কাপড়ের ক্ষেত্রফল৬৫৮ বর্গমিটারগিলাফটি মোট ৪৭টি খণ্ডে বিভক্ত, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ৯৫ সেন্টিমিটার.
উৎপাদন ব্যয়বার্ষিক মোট বাজেট (Cost)২৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল (প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)কাঁচামালের দাম ও দক্ষ শ্রমিকদের পারিশ্রমিক মিলিয়ে এই বিশাল খরচ বহন করে সৌদি সরকার. বাংলা টাকায় যা প্রায় ৭৮ কোটি টাকা
শ্রম ও সময়উৎপাদন সময়কাল ও জনবল১০ মাস (প্রায় ২৪০ জন কর্মী)অভিজ্ঞ ক্যালিগ্রাফার, হস্তশিল্পী ও কারিগরেরা প্রায় ১০ মাস ধরে সূক্ষ্ম হাতে এই গিলাফ সেলাই করেন.
কিসওয়াহ তৈরি ও ব্যবহারের বর্তমান চিত্র ও ট্রেন্ড:
  • পরিবর্তনের সময় পরিবর্তন: প্রথাগতভাবে আগে প্রতি বছর জিলহজ মাসের ৯ তারিখে (হজের দিন) কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো. তবে সাম্প্রতিক নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ মহররম (হিজরি নববর্ষের প্রথম প্রহরে) কাবার পুরোনো গিলাফ নামিয়ে নতুন কিসওয়াহ পরানো হয়.
  • ক্যালিগ্রাফি শৈলী: গিলাফের ওপর ক্যালিগ্রাফিগুলো করতে বিখ্যাত আরবি শৈলী 'সুলুস' (Thuluth) অনুসরণ করা হয়. চার কোণায় সুরা ইখলাস বৃত্তাকারে এবং বেল্ট বা হিজামে সুরা আল-ইমরান ও বাকারার আয়াত খোদাই করা থাকে.
  • পুরোনো গিলাফের ব্যবহার: পরিবর্তনের পর নামিয়ে ফেলা পুরোনো গিলাফটি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জাদুঘর এবং গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি সংস্থাকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়. 

৩. প্রাক-ইসলামী যুগ থেকে সৌদি রাজপরিবার: কিসওয়াহর ইতিহাস

কাবাকে গিলাফ দিয়ে ঢেকে রাখার প্রথাটি প্রাক-ইসলামী যুগ থেকেই চলে আসছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই পবিত্র ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকদের মতে, ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আসআদ কামিল সর্বপ্রথম ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা শরিফকে সম্পূর্ণ আচ্ছাদিত করেছিলেন।

ইসলামী খেলাফতের যুগে কাবার গিলাফ তৈরির দায়িত্ব রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে পরিবর্তিত হতো। প্রাথমিক যুগে আরবের বাইরে মিশরের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কারখানায় কিসওয়াহ তৈরি হতো এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাফেলার মাধ্যমে তা মক্কায় নিয়ে আসা হতো। পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে যথাক্রমে সিরিয়া এবং বাগদাদেও এটি তৈরি হয়েছে। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর কিসওয়াহ তৈরির একক গৌরব ও দায়িত্ব লাভ করে সৌদি আরবের আল সৌদ রাজপরিবার।

বর্তমানে মক্কার নিজস্ব কিসওয়াহ কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী তাঁত এবং ক্যালিগ্রাফি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ২৪০ জনেরও বেশি শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই গিলাফ তৈরি করা হয়। ইতালি থেকে আমদানিকৃত কাঁচা রেশমকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধুয়ে ও রং করে কিসওয়াহর রূপ দেওয়া হয়। গিলাফের গায়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, তাওহিদের বাণী এবং হজের ফজিলত সম্পর্কিত ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলা হয়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও মুসলিম হিসেবে কাবার এই আধ্যাত্মিক ইতিহাস সবসময় আমাকে আপ্লুত করে। ইতিহাসে কিসওয়াহর রং কিন্তু সবসময় কালো ছিল না; বিভিন্ন যুগে সাদা, সবুজ, লাল এবং হলুদ রঙের গিলাফ ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে আব্বাসীয় আমলের শেষভাগ থেকে কালো রংটি কিসওয়াহর স্থায়ী পরিচয় হিসেবে রূপ নেয়, যা আজও কাবার এক অনন্য গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে।

৪. পুরনো গিলাফের টুকরোগুলো কোথায় যায়?

প্রতি বছর হজের সময় বিশেষায়িত একটি কর্মী দলের মাধ্যমে কাবার পুরনো গিলাফটি সরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি গিলাফ প্রতিস্থাপন করা হয়। পুরনো গিলাফটি নামানোর পর তা সরাসরি কিসওয়াহ কারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে স্বর্ণ ও রুপার সুতোয় বোনা মূল্যবান আয়াত সংবলিত অংশগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কেটে আলাদা করা হয়। এই বিশেষ টুকরোগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে বা রাষ্ট্রপ্রধানদের উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট সাধারণ কাপড়ের অংশগুলো ছোট ছোট টুকরো করে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ, ভিআইপি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে স্মারক হিসেবে বিতরণ করা হয়।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency