ক্রীড়া প্রতিবেদক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১২ জুন, ২০২৬
নভেম্বর ২০২০। প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে আর্সেনালের ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে মাথায় মাথায় এক ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল তাঁর। মাঠে আছড়ে পড়ার পর নিথর দেহ দেখে সেদিন সবাই ধরে নিয়েছিলেন—যমদূতকে বোধহয় খুব কাছে থেকে ছুঁয়ে ফেলেছেন তিনি। মাথার খুলি ফেটে চৌচির, মাঠেই দিতে হয়েছিল কৃত্রিম অক্সিজেন। সতীর্থ, কোচ থেকে শুরু করে গ্যালারিতে থাকা পরিবার—সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, তিনি কি আদৌ বেঁচে আছেন?
বিজ্ঞান, চিকিৎসকদের অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টা আর নিজের ইস্পাতকঠিন মানসিকতায় সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন মেক্সিকান ফরোয়ার্ড রাউল হিমেনেজ। তবে সেই চোটের ৬ বছর পর, নিজের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের মেগা উদ্বোধনী ম্যাচে নিজ দর্শকদের সামনে রূপকথার নায়ক বনে যাবেন—এমনটা বোধহয় কোনো সেলুলয়েডের রূপালী ফিতাতেও কেউ কল্পনা করেনি। গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত এস্তাদিও আজতেকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঠিক সেই বৃত্তটাই সম্পূর্ণ করলেন ৩৫ বছর বয়সী এই লড়াকু স্ট্রাইকার।
২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভ সূচনা করেছে স্বাগতিক মেক্সিকো। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে রবার্তো আলভারাদোর দুর্দান্ত এক ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে এক অসাধারণ হেডে মেক্সিকোর হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন হিমেনেজ। এই গোলের পর পুরো আজতেকা স্টেডিয়াম যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে, হিমেনেজ তখন সম্পূর্ণ অন্য এক দুনিয়ায়।
গোল করার পরপরই মাঠের এক কোণে গিয়ে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে ধরেন তিনি এবং পরক্ষণেই ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সতীর্থরা দৌড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেও তাঁর চোখের পানি থামছিল না। গোল করার পর সাধারণত খেলোয়াড়রা যে বুনো উল্লাস করেন, হিমেনেজ তা করেননি। আকাশের দিকে তাকানো সেই আঙুলগুলো ছিল তাঁর বাবার উদ্দেশ্যে, যিনি চলতি বছরের মার্চ মাসেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন। গোলটি করার পর নিজের অতীত কষ্টের চেয়েও তাঁর মনে বেশি দোলা দিচ্ছিল বাবা রাউল হিমেনেজ ভেগার স্মৃতি। বাবাকে হারানোর মাত্র ৩ মাসের মাথায় দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করে অশ্রুসিক্ত নয়নে সেই গোলটি বাবাকেই উৎসর্গ করলেন মেক্সিকান এই তারকা।
২০২০ সালের সেই মারাত্মক চোটের পর টানা ৬ মাস অন্য কোনো ফুটবলারের সঙ্গে স্বাভাবিক অনুশীলন পর্যন্ত করতে পারেননি হিমেনেজ। দীর্ঘ আট মাসের চিকিৎসাধীন লড়াই শেষে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে গোল করে মাঠে নিজের প্রত্যাবর্তন ঘোষণা করেছিলেন। সেই চোটের ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে, দীর্ঘ ৬ বছর পর আজও মাথায় একটি বিশেষ সুরক্ষামূলক ‘হেডব্যান্ড’ পরেই মাঠে নামতে হয় তাঁকে।
সেই অভিশপ্ত চোটের প্রায় ছয় বছর পর, জীবনের সমস্ত বাধা পেরিয়ে ৩৫ বছর বয়সে এসে নিজের দেশের মাটিতে, ৮০ হাজার দর্শকের গগনবিদারী চিৎকারের সামনে বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়ামে গোল করলেন তিনি। ফুটবল রূপকথা বোধহয় একেই বলে!
আজতেকা স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এই দৃষ্টিনন্দন গোলটি করার মাধ্যমে মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন রাউল হিমেনেজ। দেশের হয়ে এটি ছিল তাঁর ১২৫তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আর এই ম্যাচের ৪৬তম গোলটি দিয়ে তিনি মেক্সিকোর সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। মেক্সিকোর ইতিহাসে এখন তাঁর ওপরে আছেন কেবল কিংবদন্তি হাভিয়ের হার্নান্দেজ (চিচারিতো), যার আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা ৫২টি। মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের বরপুত্র হয়ে ওঠার এই গল্প ফুটবল বিশ্ব অনেক দিন মনে রাখবে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |