আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরণের মাদ্রাসা ও সংখ্যালঘু শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও শৃঙ্খলায় আনতে এক নজিরবিহীন ও বড় ধরণের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্যের নতুন সরকার। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি অনুমোদিত থেকে শুরু করে নিবন্ধনবিহীন ও বেসরকারি সব ধরণের মাদ্রাসার নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নবান্নের পক্ষ থেকে প্রতিটি জেলার জেলাশাসক (DM) ও জেলা প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত কড়া ও জরুরি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি জেলার মাদ্রাসা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরপরই রাজ্যের সংখ্যালঘু সমাজ, বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন এবং মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একটি বড় অংশের মনে তীব্র উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
রাজ্য সরকারের প্রধান সচিব (Chief Secretary) পর্যায় থেকে পাঠানো ওই বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে—প্রতিটি ব্লক, মহকুমা ও পৌরসভা এলাকায় ঠিক কী ধরনের মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে বর্তমানে কতজন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে, তাদের কী ধরনের সিলেবাস ও পাঠদান করা হচ্ছে, বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত ও আবাসন অবস্থা কেমন এবং তাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো কেমন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রথমবার কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও স্বীকৃত মাদ্রাসার পাশাপাশি অনুদানবিহীন, সম্পূর্ণ বেসরকারি এবং সরকারের খাতায় নাম না থাকা ‘নিবন্ধনবিহীন’ সব ধরণের মাদ্রাসাকেই এই তথ্য সংগ্রহের কঠোর আওতায় আনা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা দপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী সাধারণ মূলধারার বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করছে। সেই তুলনায় ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। তবে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (WBBME) পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীই নয়, বরং উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অমুসলিম (হিন্দু ও অন্যান্য) ছাত্র-ছাত্রীরাও পড়াশোনা করে থাকে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যেও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের এক চমৎকার সম্প্রীতি ও অংশগ্রহণ রয়েছে।
নবান্ন তথা রাজ্য প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের দাবি, এই প্রশাসনিক উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক ধারণা নেওয়া। কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া সেখানে আছে কি না এবং পিছিয়ে পড়া এলাকার মাদ্রাসায় কোথায় কী ধরনের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, তা সরেজমিনে যাচাই করতেই এই তথ্য ব্যাংক (Data Bank) গড়ে তোলা হচ্ছে। সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, খারিজি বা বেসরকারি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো সমন্বিত বা নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল তথ্য নেই। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই এই ডেটা সংগ্রহের উদ্যোগ।
নবান্নের পাঠানো নির্দেশনায় একটি বিশেষ প্যারাগ্রাফ বা অংশকে কেন্দ্র করেই মূলত তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে:
"তথ্য সংগ্রহের পর যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা মাদ্রাসায় নিয়মের বড় ধরণের অসঙ্গতি, নথিপত্রের অভাব কিংবা কোনো ধরণের বেআইনি কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে প্রশাসন আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ‘সংশোধনমূলক ব্যবস্থা’ বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে।"
মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিশেষজ্ঞ ও ওলামা পরিষদের নেতৃবৃন্দ মনে করছেন, পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রশাসনিক পর্যালোচনার আড়ালে আসলে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একটি অঘোষিত ও বাড়তি সরকারি নজরদারির সুক্ষ্ম ছক সাজানো হচ্ছে।
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মূলত তিন ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে, যা এই নতুন সরকারি নির্দেশের পর বড় ধরণের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে:
বোর্ড পরিচালিত মাদ্রাসা: রাজ্যে প্রায় ছয় শতাধিক সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও সরকার অনুমোদিত মাদ্রাসা রয়েছে, যা সরাসরি ‘পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে আধুনিক সাধারণ শিক্ষার (বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি) পাশাপাশি আরবি ভাষা ও ইসলামি ধর্মতত্ত্ব পড়ানো হয়।
অনুমোদিত অনুদানবিহীন মাদ্রাসা: এগুলো সরকারের কাছ থেকে শিক্ষাগত স্বীকৃতি বা অনুমোদন পেলেও কোনো ধরণের সরকারি আর্থিক অনুদান বা বেতন ভাতা পায় না।
খারিজি বা কওমি মাদ্রাসা: এই মাদ্রাসাগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সাধারণত স্থানীয় মুসলিম জনগণের দান, যাকাত ও সদকার টাকায় পরিচালিত হয়। এখানে মূলত কুরআন, হাদিস, নামাজ, রোজা ও ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কিত নিখাদ ধর্মীয় পাঠদান করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজের অত্যন্ত দরিদ্র, অনাথ ও এতিম শিশুরাই এখানে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার সুযোগসহ পড়াশোনা করে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, রাজ্যের খারিজি মাদ্রাসাগুলোর সিংহভাগই কোনো সরকারি বা স্বীকৃত শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় তাদের প্রকৃত সংখ্যা, ছাত্র সংখ্যা এবং ফাণ্ডিংয়ের উৎস সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই ধোঁয়াশা কেটে যাবে। তবে অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরামসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন দাবি করেছে, এই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই নিরীহ শিক্ষকদের হয়রানি বা অযাচিত প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত না হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে জিলিশাসকদের এই তথ্য সংগ্রহের কাজ মাঠে কীভাবে এগোয়, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহল।
| প্রধান নির্দেশনাবলী | প্রশাসনিক ও কৌশলগত তথ্য |
| উদ্যোক্তা দপ্তর | সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার। |
| চূড়ান্ত সময়সীমা | ৫ জুলাই, ২০২৬ (জেলাশাসকদের রিপোর্ট জমার শেষ দিন)। |
| আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান | সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত, স্বীকৃত, বেসরকারি ও সমস্ত খারিজি মাদ্রাসা। |
| তদন্তের মূল বিষয় | শিক্ষার্থী সংখ্যা, সিলেবাস, পরিকাঠামো ও ফাণ্ডিং উৎস। |
| বিতর্কের কারণ | ‘অসঙ্গতি’ বা বেআইনি কাজের ক্ষেত্রে কঠোর সংশোধনমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |