ভূ-রাজনৈতিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গঠিত হতে যাওয়া একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে (Peacekeeping Force) বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সশস্ত্র সেনা অংশগ্রহণের এক চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব দিয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে তাঁর সেই প্রস্তাবকে রীতিমতো হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের দুই তারকা অনুসন্ধানী সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ানের সদ্য প্রকাশিত একটি নতুন রাজনৈতিক গবেষণাগ্রন্থে ওভাল অফিসের এই চাঞ্চল্যকর ও রুদ্ধদ্বার কূটনৈতিক বৈঠকের তথ্যটি উন্মোচন করা হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে একযোগে সাড়া জাগিয়ে প্রকাশিত হওয়া Regime Change: Inside the Imperial Presidency of Donald Trump শীর্ষক বইটিতে এই নেপথ্য কূটনীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ওয়াশিংটনের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার ঠিক ১০ দিনের মাথায় এই গোপন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
চলতি ২০২৬ সালেও বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান মাথা ব্যথার কারণ হয়ে থাকা ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুততম সময়ে বা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্ধ করার এক অভিনব প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসের ওই বিশেষ বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে হোয়াইট হাউসের সম্ভাব্য ভূমিকা ও সামরিক কৌশল নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়া ও ইউক্রেনবিষয়ক বিশেষ মার্কিন দূত তথা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ। তিনি তাঁর নিজস্ব রোডম্যাপের অংশ হিসেবে ‘ট্রাম্পস হিস্টোরিক পিস ডিল’ (Trump’s Historic Peace Deal) পরিকল্পনাটি পেশ করেন। কেলগের সেই শান্তি প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে ইউক্রেনের মাটিতে ইউরোপের তিন ন্যাটোভুক্ত দেশ—ব্রিটেন, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের শান্তিরক্ষী সেনা মোতায়েনের সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরুতেই এই ন্যাটোভুক্ত (NATO) ইউরোপীয় দেশগুলোর সেনা ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করেন। ভ্যান্সের যুক্তি ছিল, রুশ সীমান্তের এত কাছে সরাসরি ন্যাটোর বুট বা সেনা উপস্থিতি থাকলে ক্রেমলিন তথা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে আরও বড় উসকানি হিসেবে ধরে নিতে পারেন, যা যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। এর আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও ইউক্রেন সীমান্তে যেকোনো ধরনের ন্যাটো সেনা মোতায়েনকে ক্রেমলিনের জন্য ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
বইটির দাবি অনুযায়ী, ন্যাটোর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে ভ্যান্স উপস্থিত কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, ইউরোপের ভূ-রাজনীতির বাইরে অন্য কোনো নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী দেশের পেশাদার সেনা এই বিশ্বস্ত শান্তিরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারে কিনা? এর পরপরই ভ্যান্স সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি ‘ভারত’ (India)-এর নাম প্রস্তাব করেন।
জেডি ভ্যান্সের মুখে ভারতের নাম শুনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে ওঠেন এবং প্রস্তাবটি নাকচ করে বলেন:
"ভারত কখনই এটা করবে না। এই ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের পেছনে বা বিদেশের মাটিতে সেনা রাখার পেছনে তারা নিজেদের পকেট থেকে কোনো অর্থ বা ডলার ব্যয় করবে না।"
একই সাথে ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের গভীর ও অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বোঝান যে, মোদি সরকার কখনো ভারতকে এই ইউরোপীয় দ্বন্দ্বে সরাসরি জড়াবে না।
বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন সংকটের শুরু থেকেই ভারত কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে না গিয়ে সবসময় সংলাপ, কূটনীতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের পরও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) নয়া দিল্লির সেই ঐতিহ্যগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিল। ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, "কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের স্থায়ী সমাধান কখনো রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এটি কোনোভাবেই যুদ্ধের যুগ নয়।"
ভারত সরকার প্রাতিষ্ঠানিক বা দাপ্তরিকভাবে কখনো ইউক্রেনে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর প্রশ্নে সরাসরি কোনো সবুজ সংকেত বা আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। তবে এই ওভাল অফিস বৈঠকের দুই মাস পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র সাংসদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক শশী থারুর এই বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যদি ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য কোনো যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর হয়, তবে ভারত বিশ্বশান্তির স্বার্থে সীমিত আকারে সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারে।
উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের (UN) শান্তিরক্ষা মিশনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ও গৌরবময় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গত এক দশকে জাতিসংঘের নীল হেলমেট পরিধান করে দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া, কঙ্গো ও লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন সবচেয়ে বিপজ্জনক ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সফলভাবে শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করেছে ভারতীয় ব্লু হেলমেটধারীরা।
| প্রধান দিক | ওভাল অফিসের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মূল বিবরণ |
| উৎস নথি | ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জোনাথন সোয়ানের নতুন বই: ‘Regime Change’ (জুন, ২০২৬)। |
| বৈঠকের তারিখ | ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ (ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শপথের ১০ দিন পর)। |
| ভ্যান্সের প্রস্তাব | রাশিয়ার উসকানি এড়াতে ন্যাটোকে বাদ দিয়ে ইউক্রেনে ভারতের সেনা মোতায়েনের পরামর্শ। |
| ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া | হেসেই প্রস্তাব নাকচ; দাবি করেন মোদির ভারত এটার জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করবে না। |
| কিথ কেলগের প্ল্যান | ইউক্রেনের মাটিতে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের সেনা রাখার প্রাথমিক ছক। |
| ভারতের আনুষ্ঠানিক নীতি | "এটি যুদ্ধের যুগ নয়"—পদ্ধতিগতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কূটনৈতিক আলোচনার পক্ষে নয়া দিল্লি। |
বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ইউক্রেন-রাশিয়া শান্তি চুক্তির খসড়া, মার্কিন-ভারত প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন সমীকরণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
আপনার পঠন অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ করতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা বিশদভাবে জানতে আপনি এই
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |