আন্তর্জাতিক ও জ্বালানি অর্থনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬
দীর্ঘ চার মাস ধরে তীব্র অচলাবস্থা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির পর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ (Strait of Hormuz) দিয়ে বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অবশেষে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজার ও বিভিন্ন এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৬ জুন) গ্রিনিচ মান সময় (GMT) ভোর ৪টা ২১ মিনিটে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের (Brent Crude) দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৪৭ মার্কিন ডলার বা ১ দশমিক ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭৩ দশমিক ৭৯ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার নির্দেশক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুড অয়েলের দাম ১ দশমিক ৪৪ ডলার বা ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৭০ দশমিক ৪৮ ডলারে।
The Guardian ও আল-জাজিরার বিশেষ সামুদ্রিক ট্র্যাকিং তথ্যে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি সমঝোতার (MOU) পর পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা শত শত বাণিজ্যিক ও তেলবাহী কার্গো জাহাজ দীর্ঘ সময় পর মুক্ত হতে শুরু করেছে। এই ইতিবাচক পরিস্থিতির জেরে প্রায় চার মাস সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জায়ান্ট তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’ (Saudi Aramco) তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও শক্তিশালী ‘রাস তানুরা টার্মিনাল’ (Ras Tanura Terminal) থেকে আবারও আন্তর্জাতিক ট্যাংকারে তেল লোডিং বা ভরার কাজ পুরোদমে শুরু করেছে।
গ্লোবাল শিপিং ও মেরিন ট্র্যাকার স্যাটেলাইট ডেটা অনুযায়ী, রাস তানুরা টার্মিনালে ইতিমধ্যে দুটি বিশ্বের বৃহত্তম তেলবাহী জাহাজ ‘ভিএলসিসি’ (VLCC - Very Large Crude Carrier)-তে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল তোলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আরেকটি সমমানের বিশাল মাদার ট্যাংকার সমুদ্রে নোঙর করে নিজের সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছে। উল্লেখ্য, এই জাতীয় প্রতিটি ভিএলসিসি ট্যাংকারে একবারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল (2 Million Barrels) তেল পরিবহন করা সম্ভব।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিখ্যাত জ্বালানি পণ্য ও বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘স্পার্টা কমোডিটিজ’ (Sparta Commodities)-এর জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ (June Goh) বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
"হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রবাহ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়া এবং একই সাথে আমাদের প্রধান আমদানিকারক দেশ চীনের অভ্যন্তরীণ শিল্প চাহিদা এখনও প্রত্যাশামতো বা আশানুরূপ না বাড়ার কারণে গ্লোবাল ফিউচার মার্কেটে হঠাৎ করেই বড় ধরনের বিক্রির চাপ (Selling Pressure) তৈরি হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমছে।"
বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, গতকালের চেয়ে আজকের পরিস্থিতি অনেক বেশি ইতিবাচক। কারণ এর আগের দিন ওমান উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজে (Ever Lovely) অজ্ঞাত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকস্মিকভাবে ২ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনার পরপরই জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (IMO - International Maritime Organization) উপসাগরে আটকে থাকা শত শত বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বা এসকর্ট দেওয়ার বিশেষ ‘স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচি’ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে।
দুইজন উচ্চপদস্থ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে জাহাজটিতে মূলত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) হামলা চালিয়েছিল। যদিও তেহরানের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাহিনী বা জাতিসংঘের নির্ধারিত নৌপথের (Framework) বাইরে ইচ্ছাকৃতভাবে চলাচলকারী কোনো অননুমোদিত জাহাজের সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায় ইরান কোনো অবস্থাতেই নেবে না।
বিশ্বখ্যাত ওলন্দাজ বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘আইএনজি ব্যাংক’ (ING Bank)-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব তেলবাহী জাহাজ তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই মূলত গত চার মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বন্দরে বা সাগরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে পড়েছিল। আইএমও-র হিসাব অনুযায়ী, এখনও প্রায় ১১ হাজার নাবিকসহ ৫০০-র বেশি বাণিজ্যিক ভেসেল সেখানে জটে আটকে আছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আটকে থাকা এই পুরনো জাহাজগুলো একবার সম্পূর্ণ নিরাপদ আন্তর্জাতিক সীমানায় বেরিয়ে যাওয়ার পর, নতুন করে তেল পরিবহনের স্বাভাবিক গতি ও গতিপথ কিছুটা কমে যেতে পারে, কারণ সমুদ্রের মূল জলপথের কিছু অংশ এখনও মাইন পুঁতে রাখার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।
অন্যদিকে, গত বুধবার লাতিন আমেরিকার শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ ভেনিজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পও আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ চেইনে নতুন করে এক সংক্ষিপ্ত উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। তবে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা পিডিভিএসএ (PDVSA) এবং আন্তর্জাতিক প্রকৌশলীদের প্রাথমিক কারিগরি ও অবকাঠামোগত মূল্যায়নে বড় ধরনের কোনো তেলক্ষেত্র, রিফাইনারি বা শোধনাগার, অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন ও রপ্তানি টার্মিনালের ক্ষয়ক্ষতির জোরালো প্রমাণ মেলেনি। ফলে ভেনিজুয়েলা সংকটের মেঘ কেটে যাওয়ায় বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে।
মূল সূচক: বিশ্ববাজারে তেলের আন্তর্জাতিক দাম এক ধাক্কায় প্রায় ২ শতাংশের মতো হ্রাস পেয়েছে।
ব্রেন্ট ক্রুড: ব্যারেলপ্রতি ১.৪৭ ডলার কমে বর্তমানে ৭৩.৭৯ মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে।
ডব্লিউটিআই ক্রুড: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তেলের দাম ১.৪৪ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ৭০.৪৮ ডলারে নেমেছে।
সৌদি আরামকোর বড় চাল: দীর্ঘ ৪ মাস বন্ধ থাকার পর বিখ্যাত রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ২০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার মাদার ট্যাংকারে তেল লোডিং শুরু।
নিরাপত্তা ঝুঁকি: ওমান উপকূলে কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলার পর জাতিসংঘের (IMO) উদ্ধার এসকর্ট কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত।
বিশেষ আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ওপেক প্লাস (OPEC+) ভিয়েন বৈঠকের সর্বশেষ তেলের কোটা নির্ধারণ, মার্কিন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) ক্রয়ের খসড়া, হরমুজ প্রণালিতে আইএমও ও মার্কিন নৌবাহিনীর যৌথ এসকর্ট পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সব এক্সক্লুসিভ খবরের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |