আন্তর্জাতিক ও ইউরোপ ভূ-রাজনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধ নতুন করে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর নতুন করে চালানো একযোগে তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত আটজন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ৩৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সোমবারের (২৯ জুন) এই প্রলয়ংকরী হামলাকে ‘ভয়াবহ আক্রমণ’ বলে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
জাতিসংঘের (UN) সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ এই যুদ্ধে ১৬ হাজারেরও বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। ক্রেমলিন মূলত ইউক্রেনের জাতীয় গ্রিড ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস এবং জনগণের মানসিক মনোবল ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই কৌশলগত বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সোমবার দেশের মধ্যাঞ্চলীয় প্রধান শহর দিনিপ্রোর (Dnipro) একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত এবং ২৯ জন আহত হন। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণের শহর জাপোরিঝঝিয়াতে (Zaporizhzhia) একটি চলন্ত যাত্রীবাহী মিনিবাসে রুশ আত্মঘাতী ড্রোন হামলায় এক শিশুসহ তিনজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
পাশাপাশি দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি (Sumy) অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় দুই বৃদ্ধ নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির জাতীয় পুলিশ। ইউক্রেনের গ্রিড অপারেটর উক্রেনেরগো (Ukrenergo) জানিয়েছে, তীব্র গরমের কারণে সাধারণ মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহার করায় এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ছিল, তার ওপর এই রুশ হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের অন্তত আটটি বড় অঞ্চলে তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা ‘ব্ল্যাকআউট’ দেখা দিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা। ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান ও নিখুঁত দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে খোদ রাশিয়া এবং রুশ-অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে এখন তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রোববার (২৮ জুন) নিজেই জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগারগুলোতে (Oil Refineries) ইউক্রেনের দফায় দফায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে দেশটিতে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির ফলে রাশিয়ার পেট্রোল পাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা পুতিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের এই ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সামরিক বাহিনীর রসদ ও জ্বালানি সরবরাহের পথ দুর্বল করে দিয়েছে, যা পুতিন বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার গতিকে ধীর করেছে।
বিশ্বনেতার ভূমিকায় ইউক্রেন: ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের এই উদ্ভাবনী দক্ষতা তাদের যুদ্ধে একধাপ এগিয়ে রেখেছে। পূর্বে যেখানে ইউক্রেনকে বিদেশি সামরিক সহায়তার জন্য আবেদন করতে হতো, ২০২৬ সালে এসে তারা অংশীদার দেশগুলোকে এই উন্নত ড্রোন প্রযুক্তিতে উল্টো সহায়তা করছে এবং সামরিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশটিকে বিশ্বনেতায় পরিণত করেছে।
জ্বালানি সংকট এবং এই সাময়িক বিপর্যয় সত্ত্বেও ইউক্রেন আগ্রাসন বন্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা সাফ নাকচ করে দিয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, "এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ারই জয় হবে।" ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও জানিয়েছেন, ইউক্রেন বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ইনституট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ (ISW) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ক্রেমলিনের এমন অনমনীয় অবস্থান আসলে পশ্চিম ও ইউক্রেনকে রাশিয়ার শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল মাত্র। তবে তারা আরও যোগ করেছে যে, ২০২৬ সালে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার কার্যকারিতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে এবং সামরিকভাবে তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
সোমবারের এই আকাশযুদ্ধে দুই দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি পরিসংখ্যানও সামনে এসেছে:
| দেশের নাম | প্রেরিত ড্রোন/ক্ষেপণাস্ত্র | ধ্বংস/ভূপাতিত করার দাবি |
| ইউক্রেনীয় ড্রোন (রাশিয়ার আকাশে) | ২০৯+ টি ড্রোন | ২০৯টিই ভূপাতিত করার দাবি রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের |
| রুশ ড্রোন (ইউক্রেনের আকাশে) | ১০৮টি ড্রোন | ৮২টি ড্রোন ধ্বংসের দাবি ইউক্রেন বিমান বাহিনীর |
রুশ হামলা: সোমবার ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত, আহত ৩৫।
বিদ্যুৎ সংকট: উক্রেনেরগোর তথ্যমতে, হামলার পর ইউক্রেনের ৮টি অঞ্চলে তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয়।
পুতিনের স্বীকারোক্তি: ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ধ্বংস হওয়ায় রাশিয়ায় তীব্র জ্বালানি সংকট।
পশ্চিমা থিংক ট্যাংক: ২০২৬ সালে এসে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সামরিক কার্যকারিতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে বলে আইএসডব্লিউ-এর দাবি।
জেলেনস্কির আহ্বান: রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে ইউরোপের কাছে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের জরুরি তাগিদ।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |