| বঙ্গাব্দ

সেমিকন্ডাক্টর ও এআই খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 01-07-2026 ইং
  • 9829 বার পঠিত
সেমিকন্ডাক্টর ও এআই খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট
ছবির ক্যাপশন: ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট

সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ‘আল্ট্রা-গ্যাপ’ লিড নিতে ১ কোয়াড্রিলিয়ন ওন ঢালছে সিউল; বৈশ্বিক বাজারে নতুন টেক-সাম্রাজ্যের ছক

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ভূ-অর্থনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টর (Semiconductor) খাতের বৈশ্বিক আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে বহুদূরে ছিটকে দিতে এক অভাবনীয় ও ইতিহাস কাঁপানো বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি (১ কোয়াড্রিলিয়ন ওন-এর বেশি) অর্থ ঢালতে যাচ্ছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, এই মহাপ্রজেক্টের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন মেগা-হাব, অত্যাধুনিক ফিজিক্যাল এআই অবকাঠামো এবং বিশ্বমানের সুপার ডেটা সেন্টার গড়ে তুলে কোরিয়াকে পৃথিবীর এক নম্বর টেক-শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সোমবার (২৯ জুন) রাজধানী সিউলের ব্লু হাউজে (Cheong Wa Dae) কোরিয়ান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় বিনিয়োগ ব্রিফিংয়ে এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বৈশ্বিক মেমোরি চিপ বাজারের দুই অপরাজেয় সম্রাট—স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের চেয়ারম্যান লি জে-ইয়ং এবং এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান চে তাই-ওন।

জাতীয় এই মহাপরিকল্পনাটি দেশের সামনে তুলে ধরেন দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প ও জ্বালানিমন্ত্রী কিম জং-কওয়ান।

সিউলের বাইরে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ‘মেগা চিপ হাব’

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের এই ‘থ্রি মেগা প্রজেক্টস’ (Three Mega Projects) কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হলো রাজধানী সিউলের বাইরে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে সারা দেশে প্রযুক্তির সুষম বিকাশ ঘটানো। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮০০ ট্রিলিয়ন ওন (প্রায় ৫১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সরাসরি বিনিয়োগ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় হোনাম অঞ্চলের ‘গোয়াংজু’ ও ‘জিওল্লা’ প্রদেশকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্রে (Fabrication Hub) রূপান্তর করা হবে।

বিনিয়োগের সিংহভাগ জোগান দেবে টেক জায়ান্ট স্যামসাং গ্রুপ (বিনিয়োগ করবে ২.৬৫৫ কোয়াড্রিলিয়ন ওন) এবং এসকে গ্রুপ (বিনিয়োগ করবে ১.১ কোয়াড্রিলিয়ন ওন)। স্যামসাং চেয়ারম্যান লি জে-ইয়ং নিশ্চিত করেছেন যে, গোয়াংজু শহরই হবে তাদের নতুন সেমিকন্ডাক্টর ক্লাস্টারের মূল কেন্দ্র।

বিনিয়োগ ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন:

"বর্তমান এআই যুগে টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো গতি (Speed)। অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে আমাদের দ্রুততম সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল উপাদানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতি এখন এআই-এর ধাক্কায় পুরোপুরি পুনর্গঠিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তিরা যেখানে এই নতুন মহাদেশের দখল নিতে জীবনপণ লড়াই করছে, সেখানে দক্ষিণ কোরিয়াকে একটি অপরাজেয় টেক-শিল্পশক্তিতে পরিণত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।"

চুংচিয়ং ও ডেগুতে ব্যাক-এন্ড প্রযুক্তির বিকাশ

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু চিপ উৎপাদনই নয়, চিপের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এর পরবর্তী ধাপ তথা প্যাকেজিংয়ের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। সে লক্ষ্যে দেশের মধ্যাঞ্চলীয় চুংচিয়ং অঞ্চলে একটি উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং (Advanced Packaging) ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে অতিরিক্ত ৮১ ট্রিলিয়ন ওন (৫২.৫ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ডেগু ও উত্তর গিয়ংসাং অঞ্চলে সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন সরঞ্জাম (Materials, Components, and Equipment) খাতের জন্য বিশেষ উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

১৮.৪ গিগাওয়াটের দানবীয় এআই ডেটা সেন্টার

দক্ষিণ কোরিয়া খুব ভালো করেই জানে যে, হাই-পারফরম্যান্স চিপ ডিজাইন ও এআই মডেল রান করার জন্য প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎ ও ডেটা সেন্টার। এ জন্য সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে ৮.৪ গিগাওয়াট (GW) সক্ষমতার এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৩৫৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের রোডম্যাপ তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৮.৪ গিগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।

প্রেসিডেন্ট লি উল্লেখ করেন, সিউলের কাছাকাছি থাকা বর্তমান চিপ কেন্দ্রগুলো (যেমন ইয়ংইন ও পিয়ংট্যাক) ইতিমধ্যে পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচুর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকায় নতুন মেগা ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য এই অঞ্চলই সবচেয়ে উপযুক্ত ও কৌশলগত স্থান।

বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও টেক-যুদ্ধে ট্রাম্প ফ্যাক্টর

দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসেসরে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি (HBM) চিপের বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ একাই নিয়ন্ত্রণ করে, যা এনভিডিয়ার (Nvidia) মতো মার্কিন এআই জায়ান্টদের মূল চালিকাশক্তি।

তবে সিউলের এই বিশাল ঘোষণার দিনে বিশ্ববাজারে চিপের অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে সিউলের শেয়ারবাজারে সোমবার স্যামসাংয়ের শেয়ারের ৪.৮৬ শতাংশ ও এসকে হাইনিক্সের ১.৬৮ শতাংশ পতন ঘটে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকায় চিপ কারখানা স্থানান্তরের চাপের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে নিজস্ব চিপ উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করার এই দেশীয় মাস্টারস্ট্রোকটি দীর্ঘমেয়াদে কোরিয়াকে বিশ্বমঞ্চে চিপ ডিপ্লোমেসিতে বাণিজ্যের প্রধান শর্তাধীকারী হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।

এক নজরে দক্ষিণ কোরিয়ার ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের এআই রোডম্যাপ (২০২৬)

  • মহা-বিনিয়োগ: সেমিকন্ডাক্টর, ফিজিক্যাল এআই ও ডেটা সেন্টারে কোরিয়ার ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট

  • সাউথ-ওয়েস্ট ক্লাস্টার: ৫১৮ বিলিয়ন ডলারে সিউলের বাইরে গোয়াংজু ও জিওল্লায় দেশের ২য় বৃহত্তম চিপ হাব নির্মাণ

  • স্যামসাং-এর বাজি: নতুন মেগা প্রকল্পের নেতৃত্ব দিতে স্যামসাং একাই ঢালছে ২.৬৫৫ কোয়াড্রিলিয়ন ওন

  • প্যাকেজিং হাব: উন্নত চিপ প্যাকেজিং ক্লাস্টারের জন্য চুংচিয়ং অঞ্চলে ৮১ ট্রিলিয়ন ওন বরাদ্দ

  • পাওয়ার হাউস ডেটা সেন্টার: ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের এআই ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা ১৮.৪ গিগাওয়াটে নেওয়ার লক্ষ্য

আইটি ও গ্লোবাল ইকোনমি রিপোর্টার | আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিভাগ

স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের নেক্সট জেনারেশন ২-ন্যানোমিটার চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদনের রোডম্যাপ, গ্লোবাল এআই চিপ বাজারে এনভিডিয়া ও এসকে হাইনিক্সের নতুন পার্টনারশিপ চুক্তি, মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর পলিসি ও ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক আরোপের প্রভাব এবং বৈশ্বিক সিলিকন ভ্যালির সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency