| বঙ্গাব্দ

মরক্কোর ইসলামি ঐতিহ্য: কোন মাজহাবের অনুসারী তারা?

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 09-07-2026 ইং
  • 3012 বার পঠিত
মরক্কোর ইসলামি ঐতিহ্য: কোন মাজহাবের অনুসারী তারা?
ছবির ক্যাপশন: মরক্কোর ইসলামি ঐতিহ্য

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইবনে বতুতার দেশ; যেভাবে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের অনন্য কেন্দ্র হয়ে উঠল মরক্কো

ইসলামিক ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ৯ জুলাই, ২০২৬

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কো ইসলামের জ্ঞান, ফিকহ, আকিদা ও আধ্যাত্মিক চর্চার এক সমৃদ্ধ এবং ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। ইতিহাসজুড়ে এই বরকতময় ভূখণ্ডটি অসংখ্য আলেম, মুহাদ্দিস, ফকিহ ও সুফি মনীষীর জন্ম দিয়েছে। ইসলামি সংস্কৃতির অনন্য এই ধারা দেখে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে— মরক্কোর শতাব্দীর প্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্য আসলে কী? আর সেখানকার মুসলিমরা কোন মাজহাব ও আকিদা অনুসরণ করেন?

এর সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট উত্তর হলো— মরক্কোর প্রায় শতভাগ মুসলিম সুন্নি ইসলামের ‘মালিকি মাজহাব’ অনুসরণ করেন। আর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বা আকিদাগত দিকে তারা প্রধানত ‘আশআরি মতবাদ’ এবং আধ্যাত্মিক বা আত্মশুদ্ধির চর্চায় ‘জুনায়েদি সুন্নি তাসাউফ’ অনুসরণ করে আসছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই তিনটি ধারার অভূতপূর্ব সমন্বয়ই মরক্কোর ধর্মীয় ঐতিহ্য, শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি গড়ে তুলেছে।

উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের আগমন

সপ্তম শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের জয়যাত্রার মাধ্যমে মরক্কোতে ইসলামের আলো পৌঁছায়। বিশিষ্ট মুসলিম সেনাপতি উকবা ইবন নাফি (রহ.)-এর ঐতিহাসিক অভিযানের পর এই অঞ্চলে ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় আমাজিঘ বা বারবার (Berber) জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ ইসলামের ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। এর ফলে মরক্কো ধীরে ধীরে ইসলামি সভ্যতা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ধর্মীয় পরিচয়ের তিন ধ্রুবক

মরক্কোতে ধর্মীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তিকে ‘আস-সাওয়াবিত আদ-দীনিয়্যাহ’ বা ‘ধর্মীয় ধ্রুবক’ বলা হয়। এগুলো রাষ্ট্রের নীতিতেও বিশেষভাবে অনুসৃত:

  • ফিকহে (আইন ও বিধি-বিধান): ইমাম মালিক ইবন আনাস (রহ.)-এর ‘মালিকি মাজহাব’।

  • আকিদায় (বিশ্বাস): ইমাম আবুল হাসান আশআরি (রহ.)-এর ‘আশআরি মতবাদ’।

  • তাসাউফে (আধ্যাত্মিকতা): ইমাম জুনায়েদ আল-বাগদাদি (রহ.)-এর সুন্নাহভিত্তিক ‘জুনায়েদি ধারা’।

কেন মরক্কোতে মালিকি মাজহাব এত প্রভাবশালী?

মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক ইবন আনাস (রহ.) (৯৩–১৭৯ হিজরি) পবিত্র মদিনা শরিফে বসবাস করতেন। তাঁর বিখ্যাত হাদিস ও ফিকহের প্রাচীন সংকলন ‘আল-মুওয়াত্তা’ এই মাজহাবের মূল ভিত্তি। মালিকি ফিকহের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘আমালু আহলিল মাদিনা’— অর্থাৎ সাহাবিদের যুগ থেকে মদিনাবাসীর ধারাবাহিক আমলকে শরয়ি দলিল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।

উত্তর আফ্রিকায় মালিকি মাজহাবের বিস্তারে ইমাম সাহনুন (রহ.) সংকলিত ‘আল-মুদাওয়ানাহ আল-কুবরা’ গ্রন্থটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, আন্দালুস বা মুসলিম স্পেন থেকে আগত বহু আলেম ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার মরক্কোতে আশ্রয় নিলে সেখানে মালিকি ফিকহের বিকাশ আরও বেগবান হয়। এই ফিকহে কুরআন ও সুন্নাহর পাশাপাশি ‘মাসলাহা’ (জনকল্যাণ) এবং ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ (শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য) বিবেচনায় রেখে সমাধান দেওয়া হয় বিধায় উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

‘আমিরুল মুমিনিন’ ও মরক্কোর রাজতন্ত্র

মরক্কোর ইসলামি ব্যবস্থার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো— দেশটির বাদশাহ ‘আমিরুল মুমিনিন’ (মুমিনদের নেতা) উপাধি ধারণ করেন। ২০১১ সালের মরক্কোর আধুনিক সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাদশাহ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ধর্মীয় অভিভাবক। তিনি দেশের ধর্মীয় ঐক্য, সুন্নি ইসলামের ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান ‘আলাউয়ি’ রাজবংশ সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মরক্কো শাসন করছে এবং তারা নিজেদের বংশধারাকে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হাসান ইবন আলী (রা.)-এর মাধ্যমে পবিত্র আহলে বাইতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে।

জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক আলোকবর্তিকা

মরক্কোর মাটিকে ধন্য করেছেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম আল-কাদি ইয়াদ (রহ.)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা ও অধিকার বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ-শিফা’ মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত সমাদৃত। এছাড়া, মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত ‘আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়’, যা ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি (রহ.) নামক এক মহীয়সী নারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ইউনেস্কো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।

বিশ্বখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক ও ভূগোলবিদ ইবনে বতুতা (রহ.) ছিলেন মরক্কোরই সন্তান। তিনি মালিকি ফিকহে উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘কাজি’ বা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী ‘আর-রিহলা’ আজো বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সেরা সম্পদ। মরক্কোতে কিছু বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে হানাফি বা শাফেয়ি মাজহাবের উপস্থিতি থাকলেও, রাষ্ট্রের অফিশিয়াল আইন ও ফতোয়ার মূল ভিত্তি কিন্তু এই মালিকি ফিকহ-ই।

এক নজরে মরক্কোর ইসলামি ঐতিহ্য ও তিন ভিত্তি

  • মাজহাব: মরক্কোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সুন্নি ইসলামের মালিকি ফিকহ বা মাজহাবের অনুসারী

  • আকিদা ও সুফিবাদ: দেশটিতে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আশআরি আকিদা এবং আত্মশুদ্ধিতে জুনায়েদি তাসাউফ অনুসৃত হয়

  • বাদশাহর পদবি: মরক্কোর বাদশাহ সংবিধানে ‘আমিরুল মুমিনিন’ বা মুসলিমদের নেতা হিসেবে স্বীকৃত

  • প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়: ৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মরক্কোর ‘আল-কারাউইয়্যিন’ বিশ্বের প্রাচীনতম সচল বিশ্ববিদ্যালয়

  • বিখ্যাত মনীষী: বিশ্বখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা এবং ‘আশ-শিফা’ গ্রন্থের লেখক কাদি ইয়াদ মরক্কোর গর্ব

ইসলামিক ডেস্ক | ইসলামি ফিকহের ইতিহাস, মালিকি মাজহাব, আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তর আফ্রিকার ইসলাম সেল

মরক্কোর রাজপরিবারের বর্তমান ধর্মীয় কার্যক্রম, আল-কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষা কারিকুলাম এবং মালিকি ফিকহের আধুনিক ফতোয়া বোর্ডের সবশেষ গবেষণামূলক রিপোর্টের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency