| বঙ্গাব্দ

হাত মেলানোর অপেক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 23-10-2026 ইং
  • 47849 বার পঠিত
হাত মেলানোর অপেক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত
ছবির ক্যাপশন: অপেক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ও ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আগামী নভেম্বর মাসে এ সফর হতে পারে বলে ইঙ্গিত থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, সফরের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, বাণিজ্য ও দীর্ঘ সীমান্তে আবদ্ধ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সম্পর্কের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরেও দুই সরকার কতটা কার্যকর আলোচনা, সমঝোতা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপর।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন আসে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে ফেরেন তিনি।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি করে। বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন শক্তিশালী, তেমনি তা নানা বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জেও পরিপূর্ণ।

দেশে ফেরার পরপরই তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। এর মধ্যেই দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় মারা যান বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এবং বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন হয়। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতি ও জনজীবনের সংকট মোকাবিলা করা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের কূটনৈতিক বার্তা

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক ইঙ্গিত আসে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর। তার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তার হাতে তুলে দেন। জয়শঙ্কর আশা প্রকাশ করেন, খালেদা জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

এখানে দুটি কূটনৈতিক উদ্যোগের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। অন্যদিকে, জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং টেলিফোনে কথা বলেন। এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারেক রহমান সরকারের প্রতি আগ্রহ

বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। চীনও নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানায়।

বাংলাদেশের জন্য এই আন্তর্জাতিক মনোযোগ একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটির প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একই সঙ্গে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাও জরুরি। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানোর কথা বলেছেন।

দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার

বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে দুই দেশের সম্পর্কের প্রতি নয়াদিল্লির বাড়তি মনোযোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়ার খবরও এসেছে।

দিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভারতের আমন্ত্রণ খোলা রয়েছে এবং সফর নিয়ে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে সফরের জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুকূল পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।

তিস্তা, সীমান্ত ও শেখ হাসিনা: আলোচনার কঠিন বিষয়

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, ভিসা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ। বাংলাদেশের জন্য তিস্তার পানিবণ্টন দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অন্যদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে বিতর্ক থাকায় বিষয়টি ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ইস্যুগুলো এড়িয়ে গিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে তা সাময়িক হতে পারে; বরং পারস্পরিক উদ্বেগ স্বীকার করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের বার্তা

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিতে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারভুক্ত দেশ। তরেক রহমানের এই বক্তব্যকে জাতীয় ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ছবি তোলার বাইরে বাস্তব সহযোগিতার পরীক্ষা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে উঠলে দুই দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে লাভবান হতে পারে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবসার ব্যয় কমাতে এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুবিধার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। যতক্ষণ না দুই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করছে, ততক্ষণ সফরটিকে চূড়ান্ত না বলে আলোচনাধীন হিসেবে বিবেচনা করাই যথাযথ। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দুই দেশ শুভেচ্ছাকে কার্যকর চুক্তিতে, মতবিরোধকে সংলাপে এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে কি না, তার ওপর।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency