| বঙ্গাব্দ

যে বিয়েতে বরকতের দোয়া করেছিলেন নবীজি (সা.)

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 24-10-2026 ইং
  • 17232 বার পঠিত
যে বিয়েতে বরকতের দোয়া করেছিলেন নবীজি (সা.)
ছবির ক্যাপশন: যে বিয়েতে বরকতের দোয়া করেছিলেন

পিতৃহীন বোনদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সুখ বিসর্জন: জাবির (রা.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগের শিক্ষা

প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ

পরিবারের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা, আবেগ ও দায়িত্ববোধ কেবল মুখের মিষ্টি কথায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ফুটে ওঠে কাজের মাধ্যমে। কখনো কখনো নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ, আনন্দ ও ভালোলাগাকে একপাশে সরিয়ে রেখে পরিবারের আপন মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোই হয়ে ওঠে একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগে এমনই এক অনন্য ও হৃদয়ছোঁয়া নজির স্থাপন করেছিলেন তরুণ সাহাবি হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। পিতৃহীন বোনদের ভবিষ্যৎ গড়তে ও আগলে রাখতে তিনি নিজের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে যে ত্যাগ ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

বোনদের আগলে রাখতে তরুণ জাবিরের কালজয়ী সিদ্ধান্ত

ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধের চরম আবেগঘন মুহূর্তে হজরত জাবির (রা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। শাহাদাতের সময় তিনি সাতটি বা নয়টি ছোট ছোট নাবালেগ কন্যাসন্তান রেখে যান। হঠাৎ করেই পিতৃহীন এই বোনদের অভিভাবকত্ব ও লালন-পালনের পুরো গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ ভাই জাবিরের কাঁধে।

বোনদের সুশিক্ষিত ও সুন্দরভাবে মানুষ করার চিন্তা থেকে হজরত জাবির (রা.) নিজের বয়সের কোনো কুমারী তরুণীকে বিয়ে না করে, এক অভিজ্ঞ ও বয়োবৃদ্ধা (বিধবা) নারীকে বিয়ে করার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন।

পরবর্তীতে বিশ্বনবি রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন জাবির (রা.)-এর বিয়ের খবর শুনলেন, তখন তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত মমতাময় এক কথোপকথন হয়:

রাসুলুল্লাহ (সা.): ‘হে জাবির! তুমি কি বিয়ে করেছ?’

জাবির (রা.): ‘হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ!’

রাসুলুল্লাহ (সা.): ‘কুমারী মেয়েকে বিয়ে করেছ, নাকি কোনো বিধবা বা বয়োবৃদ্ধাকে?’

জাবির (রা.): ‘একজন বিধবা নারীকে।’

নবীজি (সা.): ‘তুমি কোনো কুমারী মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তো তুমিও তার সাথে আনন্দ-আমোদ করতে পারতে এবং সেও তোমার সাথে হাসিখুশি সময় কাটাতে পারত!’

তখন তরুণ জাবির (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তের পেছনের মূল উদ্দেশ্য ও হেকমত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে তুলে ধরে বললেন—

‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা শাহাদাত বরণের সময় ছোট ছোট অনেকগুলো মেয়ে রেখে গেছেন। আমি চাইনি তাদের মতো অনভিজ্ঞ কোনো তরুণীকে ঘরে এনে তাদের ওপর বসিয়ে দিতে, যে তাদের ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারবে না। তাই আমি এমন একজন অভিজ্ঞ নারীকে বিয়ে করেছি, যিনি আমার বোনদের যত্ন নিতে পারবেন, তাদের চুল আঁচড়ে দেবেন, তাদের সুন্দর শিষ্টাচার ও আদব-কায়দা শেখাবেন এবং সুন্দরভাবে গড়ে তুলবেন।’ সুবহানাল্লাহ!

তরুণ জাবিরের এমন অতুলনীয় দায়িত্ববোধ, বিচক্ষণতা এবং বোনদের প্রতি গভীর ভালোবাসা দেখে আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যন্ত আনন্দিত ও আপ্লুত হন। তিনি জাবিরের সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁর জন্য বরকতের বিশেষ দোয়া করে বলেন:

بَارَكَ اللهُ لَكَ (উচ্চারণ: ‘বারাকাল্লাহু লাকা’ — অর্থ: ‘আল্লাহ আপনার/তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন’)।

(সহিহ বুখারি: ৫৩৬৭, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)

কুরআন ও হাদিসের চোখে বোনদের লালন-পালন ও এতিমের এহসান

ইসলামে পরিবারের দেখভাল করা এবং এতিম বা অসহায় স্বজনদের যত্ন নেওয়ার ফজিলত অত্যন্ত অপরিসীম:

১. বোন ও স্বজনদের দেখভালের জান্নাতি সওয়াব:

পিতার অনুপস্থিতিতে বোনদের দেখাশোনা করা এবং তাদের সঠিক দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া জাহান্নাম থেকে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:

“যার তিনটি কন্যা বা তিনটি বোন রয়েছে এবং সে তাদের প্রতি ধৈর্য ধারণ করে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পানাহার ও পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে—কিয়ামতের দিন তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।”

(সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৬৬৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৬৮২৬)

২. এতিম স্বজনদের প্রতি এহসান:

পিতার শাহাদাতের পর জাবির (রা.)-এর বোনেরা ছিল এতিম। কুরআনে মহান আল্লাহ এতিমদের কল্যাণে কাজ করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন:

“আর তারা তোমাকে এতিমদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলে দাও, তাদের অবস্থার সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করা উত্তম।”

(সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২০)

ঘটনাটির মহান ৩টি শিক্ষা

  • ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে পরিবারের কল্যাণ: নিজের ব্যক্তিগত আরাম- আয়েশ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজন ও এতিম স্বজনদের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া একজন আদর্শ মুমিনের মূল লক্ষণ।

  • বিয়ের ক্ষেত্রে বিচক্ষণ জীবনসঙ্গী নির্বাচন: বিবাহিত জীবনে কেবল রূপ বা বয়স নয়; বরং পরিবারের সার্বিক কল্যাণ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও দ্বীনদারি বিবেচনা করা এক বিশেষ প্রজ্ঞার পরিচয়।

  • বিশ্বনবির (সা.) ভালোবাসাময় সমর্থন: রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সাহাবিদের ব্যক্তিগত জীবনের খোঁজ রাখতেন এবং ভালো কাজের জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে বরকতের দোয়া করতেন।

আজকের সমাজে যখন সামান্য স্বার্থ বা তুচ্ছ কারণে পারিবারিক বন্ধন ও সম্পর্কগুলো ভাঙনের মুখে পড়ে, তখন হজরত জাবির (রা.)-এর এই আদর্শ আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসা, ত্যাগ এবং দায়িত্ববোধ দিয়ে পুরো পরিবারকে আগলে রাখতে হয়

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency