ভারতের ঝাড়খণ্ডে থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে পুলিশ কনস্টেবলের হাতে নারী ধর্ষণের শিকার, ওসিসহ বরখাস্ত ৫
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একটি থানায় পারিবারিক ঝামেলার অভিযোগ জানাতে গিয়ে খোদ পুলিশের এক কনস্টেবলের হাতে এক নারী পাশবিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি, পেশাগত দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও আরও চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) রাতে ঝাড়খণ্ডের সেরাইকেলা-খারসাওয়ান জেলার গামহারিয়া থানায় অভিযোগ জানাতে হাজির হয়েছিলেন ওই নারী।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ স্বামীর সঙ্গে মারাত্মক ঝগড়ার পর শারীরিক নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এরপর তিনি স্থানীয় এক প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সরাসরি থানায় যোগাযোগ করেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে গামহারিয়া থানার একটি পুলিশ টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
থানার ভেতরেই পৈশাচিক নির্যাতন
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নারীকে থানায় নিয়ে আসার পর তাঁর প্রাথমিক বিশ্রামের সুবিধার্থে থানারই একটি নির্দিষ্ট কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে, গভীর রাতে যখন ওই নারী একা ওই কক্ষে অবস্থান করছিলেন, তখন থানার ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কর্মরত এক পুলিশ কনস্টেবল সেখানে প্রবেশ করেন এবং তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সেরাইকেলার সিনিয়র পুলিশ সুপার (এসপি) মনোজ স্বর্গিয়ারী তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) অনুভব ভরদ্বাজের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি দ্রুত প্রাথমিক অনুসন্ধান চালিয়ে ঘটনার সত্যতা পান বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এরপরই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে অভিযুক্ত কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতের কঠোর নির্দেশে তাঁকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষা
পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও চরম দায়িত্বহীনতার দায়ে গামহারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং আরও চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ বা সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় অভিযুক্ত কনস্টেবলের গায়ে পরিহিত পোশাক আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অপরাধের প্রমাণ পাকাপোক্ত করতে ওই পোশাকগুলো দ্রুত রাজধানী রাঁচির ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে (FSL) পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া
থানার ভেতরে খোদ পুলিশের মাধ্যমে নারী নির্যাতনের এই বর্বরোচিত ঘটনায় ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহির অভাব নিয়ে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।
ঝাড়খণ্ড বিজেপির সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য আদিত্য সাহু সংবাদমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করে বলেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের উৎকোচ বা ঘুষ দিয়ে পুলিশ সদস্যরা তাঁদের পছন্দের থানায় পোস্টিং বা পদায়ন নেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সরকারের শীর্ষ মহলের নীরব প্রশ্রয়ে এক শ্রেণির পুলিশ কর্মকর্তা ও দলীয় ক্যাডাররা অবৈধভাবে বালু, লৌহ আকরিক ও কয়লা চুরির অবাধ সুযোগ করে দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই মারাত্মক অবনতির কারণে রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতাসীন জেএমএম, কংগ্রেস ও আরজেডি জোট সরকারের ওপর থেকে আস্থা সম্পূর্ণভাবে উঠে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।