সিরাজগঞ্জে কোটি টাকায় নির্মিত চৌবাড়ী ২০ শয্যা হাসপাতাল ৩ বছর ধরে তালাবদ্ধ: ৫০ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি চুরি
প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, জাঁকজমকপূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ভবন হস্তান্তরের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী ২০ শয্যা হাসপাতালের কার্যক্রম আজ পর্যন্ত চালু হয়নি। ফলে প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রটি গত তিন বছর ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে। অযত্ন, অবহেলা ও দীর্ঘমেয়াদি জনবল সংকটের সুযোগে হাসপাতালের প্রায় ৫০ লাখ টাকার মূল্যবান চিকিৎসাসামগ্রী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও এসি চুরির ঘটনা ঘটেছে। জনসেবার মহান উদ্দেশ্যে নির্মিত হাসপাতালটি এখন নিজেই চরম অব্যবস্থাপনা আর হতাশার এক নির্মম প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
নির্মাণ ও হস্তান্তরের পটভূমি
জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল ও ভূমি অধিগ্রহণ শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. হাবিবে মিল্লাত সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী এলাকায় এই ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শেষ হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সম্পূর্ণ নির্মিত ভবনটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।
কিন্তু ভবন হস্তান্তরের দীর্ঘ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এর চিকিৎসা কার্যক্রমের শুভসূচনা হয়নি। ১৯ কোটি ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৪ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ বাবদ ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং জমি অধিগ্রহণে ৩ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৪ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।
বর্তমান বেহাল দশা ও চুরি যাওয়া মালামাল
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটির মূল ফটকে বড় তালা ঝুলছে এবং আশপাশে ময়লার স্তূপ জমে রয়েছে। পুরো চত্বরজুড়ে উুঁচু ঘাস ও আগাছা গজিয়ে বনের রূপ নিয়েছে। মূল দুই তলা হাসপাতালের পাশাপাশি চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য তিনটি পৃথক আবাসিক ভবন (দুটি দোতলা ও একটি তিনতলা) এবং অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহন ও জেনারেটর রাখার আলাদা দুটি শেড নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে দেখাভালের লোক না থাকায় কোটি টাকার এই সরকারি অবকাঠামো এখন নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি তালাবদ্ধ থাকায় রাতের আঁধারে সুযোগসন্ধানীরা মূল্যবান সরকারি সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে।
সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোমিন উদ্দিন জানান, তালাবদ্ধ অবস্থার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল ভবনের ভেতরে থাকা ৩টি বড় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), বৈদ্যুতিক ফ্যান, বাতি, দামি স্যানিটারি ফিটিংস সামগ্রী, জেনারেটরের যন্ত্রাংশ এবং অপারেশন থিয়েটারের (অস্ত্রোপচার কক্ষ) অধিকাংশ মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী ও বৈদ্যুতিক মালামাল চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি নিজেই বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছিলেন।
অন্যদিকে, বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফর রহমান জানান, তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন এবং জনবলের অভাবে দীর্ঘদিন হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় সেখানকার বিভিন্ন সরঞ্জাম ও মালামাল চুরির কথা তিনিও শুনেছেন।
পুলিশ ও সিভিল সার্জনের বক্তব্য
কামারখন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাশমত আলি জানান, চৌবাড়ী হাসপাতালের সরকারি সরঞ্জাম চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সন্দেহভাজন ১১ জনকে গ্রেফতার করে ইতিমধ্যে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধার এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বাকিদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশের জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন নুরুল আমিন হাসপাতালের মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরির সত্যতা স্বীকার করে জানান, হাসপাতালটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের আবেদন জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে জনবল বরাদ্দ ও প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া মাত্রই দ্রুততম সময়ের মধ্যে চৌবাড়ী ২০ শয্যা হাসপাতালটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।