| বঙ্গাব্দ

. কখন দরুদ শরিফ পড়বেন? কুরআন-হাদিসের আলোকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 04-11-2026 ইং
  • 5435 বার পঠিত
. কখন দরুদ শরিফ পড়বেন? কুরআন-হাদিসের আলোকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত
ছবির ক্যাপশন: দরুদ শরিফ পাঠের ফজিলত

কখন দরুদ শরিফ পড়বেন? কুরআন-হাদিসের আলোকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সময় ও ফজিলত

প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো দরুদ শরিফ পাঠ। এটি মুমিনের জন্য বিশেষ সওয়াব অর্জনের মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজেই নবীজির (সা.) ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসেও দরুদ পাঠের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে কিছু সময় ও পরিস্থিতিতে দরুদ পাঠের গুরুত্ব আরও বেশি। তাই প্রতিটি মুসলমানের জানা প্রয়োজন, কখন এবং কীভাবে দরুদ শরিফ পাঠ করা উত্তম।

দরুদ শরিফের অর্থ ও ইসলামি তাৎপর্য

দরুদ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ কল্যাণ, শুভকামনা ও রহমত প্রার্থনা। ইসলামি পরিভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত, সম্মান ও শান্তি কামনা করাকে দরুদ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনের সুরা আল-আহজাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর ওপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারাও তার জন্য রহমতের দোয়া করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ কর।

এই আয়াতের মাধ্যমে নবীজির (সা.) প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর প্রতি রহমত ও প্রশংসা, ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে দোয়া এবং মুমিনদের পক্ষ থেকে দরুদ ও সালাম নিবেদন করা হয়।

দরুদ শরিফ পাঠের বিশেষ ফজিলত

দরুদ পাঠের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর রহমত লাভের পাশাপাশি নবীজির প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন। হাদিসে এ আমলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

১. একবার দরুদে দশবার রহমত

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮)

অর্থাৎ, সামান্য সময় ব্যয় করে একবার দরুদ পাঠের মাধ্যমেও একজন মুমিন আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করতে পারেন।

২. কিয়ামতের দিন নবীজির নৈকট্য

দরুদ পাঠকারীদের জন্য কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকটবর্তী হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে।

তিনি বলেছেন—

إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً

অর্থ: কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। (তিরমিজি, হাদিস ৪৮৪)

৩. নবীজির নাম শুনে দরুদ না পড়ার বিষয়ে সতর্কতা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে তার প্রতি দরুদ পাঠ করা উচিত। এ বিষয়ে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে।

তিনি বলেন—

الْبَخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ

অর্থ: কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উল্লেখ করা হলো, অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করল না। (তিরমিজি, হাদিস ৩৫৪৬)

কোন ১০ সময়ে দরুদ শরিফ পাঠ করা উত্তম?

দরুদ শরিফ পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই। দিন-রাতের যেকোনো সময় এটি পাঠ করা যায়। তবে কুরআন ও হাদিসে কয়েকটি বিশেষ সময় ও অবস্থায় দরুদ পাঠের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১. নামাজের শেষ বৈঠকে

প্রতিদিনের ফরজ ও নফল নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠের পর দরুদে ইবরাহিম পড়া হয়। এটি নামাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দরুদে ইবরাহিমের শুরু হলো—

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তার পরিবারের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। (বুখারি, হাদিস ৩৩৭০; মুসলিম, হাদিস ৪০৬)

২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে

কোনো আলোচনা, ওয়াজ, মাহফিল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রিয়নবীর নাম শুনলে তার প্রতি দরুদ পাঠ করা উচিত। এটি নবীজির প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।

৩. দোয়ার শুরুতে ও শেষে

দোয়া করার সময় প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা, এরপর নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা এবং দোয়া শেষেও দরুদ পড়া উত্তম আদব।

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে দোয়ার সঙ্গে নবীজির ওপর দরুদ পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস ৪৮৬)

৪. আজান শেষ হওয়ার পর

আজান শুনলে মুয়াজ্জিনের উচ্চারিত বাক্যগুলোর জবাব দেওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করতে হয়। এরপর তার জন্য আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও ওয়াসিলা প্রার্থনা করা সুন্নত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ

অর্থ: তোমরা যখন মুয়াজ্জিনের আজান শুনবে, তখন সে যা বলে তোমরাও তা বলবে। এরপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪)

৫. জুমার দিন ও আগের রাতে

সপ্তাহের বিশেষ দিন শুক্রবারে বেশি বেশি দরুদ পাঠের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুমার দিন ও রাতকে দরুদ পাঠের জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগানো উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ

অর্থ: তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। (আবু দাউদ, হাদিস ১০৪৭)

৬. কোনো মজলিস বা বৈঠক শেষ করার সময়

ইসলামি আলোচনা, পারিবারিক বৈঠক কিংবা অন্য কোনো মজলিস শেষ করার সময় আল্লাহর জিকির ও নবীজির ওপর দরুদ পাঠ করা ভালো আমল।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, যে মজলিসে আল্লাহর স্মরণ এবং রাসুলুল্লাহর ওপর দরুদ পাঠ করা হয় না, সেই মজলিসের কারণে অংশগ্রহণকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। (তিরমিজি, হাদিস ৩৩৮০)

৭. মসজিদে প্রবেশের সময়

মসজিদে প্রবেশের সময় নির্ধারিত দোয়ার পাশাপাশি নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করা যায়। এতে আল্লাহর স্মরণ ও রাসুলুল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়।

৮. মদিনায় মসজিদে নববি ও রওজা জিয়ারতের সময়

পবিত্র মদিনায় মসজিদে নববিতে প্রবেশ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের সময় তার প্রতি সালাম ও দরুদ পেশ করা উচিত। এটি একজন মুসলমানের জন্য গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ।

৯. বিপদ-আপদ ও দুশ্চিন্তার সময়

জীবনের কঠিন পরিস্থিতি, মানসিক অস্থিরতা কিংবা বিপদের সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি দরুদ শরিফ পাঠ করা যায়। এটি একটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। তাই সংকটের সময়ও নিয়মিত দরুদ পাঠের অভ্যাস রাখা ভালো।

১০. বই, চিঠি ও লেখালেখির সময়

কোনো ইসলামি বই, প্রবন্ধ, চিঠি কিংবা আলোচনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম উল্লেখ করার সময় তার নামের সঙ্গে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লেখা বা উচ্চারণ করা উচিত। এটি নবীজির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রচলিত ইসলামি রীতি।

প্রতিদিন দরুদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলুন

দরুদ শরিফ এমন একটি বরকতময় আমল, যা একজন মুসলমানের দৈনন্দিন ইবাদতের অংশ হতে পারে। এর জন্য আলাদা কোনো সময় নির্ধারণের প্রয়োজন নেই। নামাজের পর, অবসর সময়ে, চলাফেরার সময় কিংবা জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা যায়।

হাদিসে একবার দরুদ পাঠে আল্লাহর পক্ষ থেকে দশবার রহমত লাভ এবং কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য অর্জনের সুসংবাদ রয়েছে।

তবে নবীজির প্রতি ভালোবাসা কেবল দরুদ পাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার সুন্নাহ অনুসরণ, উত্তম চরিত্র ধারণ এবং আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মধ্য দিয়েও সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিয়মিত দরুদ শরিফ পাঠ এবং প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামিক স্কলার, মুফাসসিরে কুরআন ও পীর সাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency