| বঙ্গাব্দ

আশুলিয়া লাশ পোড়ানো মামলা: রাজনৈতিক সহিংসতার বিচারে নতুন মোড়?

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 13-08-2025 ইং
  • 4213708 বার পঠিত
আশুলিয়া লাশ পোড়ানো মামলা: রাজনৈতিক সহিংসতার বিচারে নতুন মোড়?
ছবির ক্যাপশন: আশুলিয়া লাশ পোড়ানো মামলা

আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড: রাজনৈতিক সহিংসতার বিচারে নতুন দিগন্ত?

বিশেষ প্রতিবেদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ রাজনৈতিক সহিংসতার অসংখ্য বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদল, আন্দোলন এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার অধরা থেকে গেছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির মাঝেই আশুলিয়ায় হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানোর মতো নৃশংস ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার বিচার প্রক্রিয়া দেশবাসীর মনে নতুন করে আশা ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। বুধবার (১৩ আগস্ট, ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) এই মামলার অভিযোগ গঠনের দ্বিতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার প্রক্রিয়ায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আশুলিয়া ও চানখারপুল: দুটি মামলার বর্তমান চিত্র

বুধবার সকালে আশুলিয়া মামলায় কারাগারে থাকা আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এই মামলায় মোট আসামি ১৬ জন, যার মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাইফুল ইসলামসহ আটজন এখনো পলাতক। পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানির জন্য ট্রাইব্যুনাল আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে।

গত সপ্তাহে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর পাঁচজনের লাশ এবং আহত একজনকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগের দিন, ৪ আগস্ট, আশুলিয়া থানার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এমন নৃশংসতার অভিযোগ দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

একই দিনে, চানখারপুল হত্যাকাণ্ড মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের তৃতীয় দিন অতিবাহিত হয়। এই মামলায় এখন পর্যন্ত তিনজন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন। দুটি মামলাই প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক সময়ের সহিংস ঘটনাগুলোকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: বিচারহীনতার সংস্কৃতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহিংসতার বিচার না হওয়া একটি সাধারণ প্রবণতা।

  • ১৯৭৫-এর কলঙ্ক: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই কালো আইন বাতিল করে বিচার শুরু করে, যা ছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রথম বড় পদক্ষেপ।

  • সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক সহিংসতা: জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে বহু রাজনৈতিক কর্মী হত্যা ও গুমের শিকার হন। ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র ফিরে এলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কমেনি।

  • দ্বিদলীয় সংঘাতের যুগ (১৯৯১-২০০৬): এই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সংঘাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। হরতাল, অবরোধ এবং জ্বালাও-পোড়াও அன்றாட ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়, যা ছিল রাজনৈতিক সহিংসতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ সংযোজন।

  • সাম্প্রতিক দশক: ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে হওয়া সহিংসতা এবং বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত রেখেছে।

এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আশুলিয়ার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে মামলার তাৎপর্য

আশুলিয়া মামলার বিচার প্রক্রিয়াটি কয়েকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা: মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। এখন সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার মামলা এই ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত হওয়াটা এর কার্যপরিধির বিস্তৃতি নির্দেশ করে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই বিচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের নৃশংস রাজনৈতিক অপরাধ দমনে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

২. রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিচার: মামলায় একজন সাবেক এমপির নাম থাকাটা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক ছত্রছায়াতেই এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, "এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি প্রমাণ হয় যে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ পার পাবে না, তবে তা দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে।"

৩. ভবিষ্যতের জন্য বার্তা: ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই বিচার প্রক্রিয়াটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। তা হলো, রাজনৈতিক আদর্শের নামে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডকে আর 용্য করা হবে না।

তবে এই বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, তার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং বাংলাদেশ একটি সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো মামলায় অভিযোগ গঠনের বিষয়ে দ্বিতীয় দিনের শুনানি আজ। শুনানি করবেন ট্রাইব্যুনাল নিযুক্ত আইনজীবী ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। 

বুধবার (১৩ আগস্ট) সকালে এই মামলায় গ্রেফতার ৮ জনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এর আগে, গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ এ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরে প্রসিকিউশন। 

এ সময় তাদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট হত্যার পর ৫ জনের লাশ ও আহত ১ জনকে পুড়িয়ে দেওয়া এবং ৪ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে ১ জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

এই মামলায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ৮ জন পলাতক আছেন। আজ তাদের পক্ষে শুনানি করবেন ট্রাইব্যুনাল নিযুক্ত আইনজীবী।

অপরদিকে, চানখারপুল হত্যাকাণ্ডের মামলায় তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ হবে আজ। এখন পর্যন্ত এই মামলায় ৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।

সূত্র: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গুগল রিসার্চ, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের আর্কাইভ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাক্ষাৎকার।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency