প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনীতির এক অপূরণীয় নক্ষত্র, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসান হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৫০-এর দশকে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এ দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল, ২০২৫ সালের এই বিদায় বেলায় এসে সেই ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটল।
১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম (পুতুল) ১৯৫০-এর দশকে যখন বেড়ে উঠছিলেন, তখন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে ছিল ভাষা আন্দোলন ও স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষা। ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তিনি মূলত পর্দার আড়ালেই ছিলেন। যুদ্ধের ৯ মাস তিনি দুই শিশু সন্তানসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী ছিলেন। স্বাধীনতার পর ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি বিশ্বনেতাদের সাথে বাংলাদেশের সেতুবন্ধন তৈরিতে প্রথমবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত হন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে বিএনপি। ১৯৮৩ সালে ৩ জানুয়ারি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি দেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেন। দীর্ঘ ৯ বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি একবারের জন্যও পিছু হটেননি, যার ফলে তাঁর নাম হয় ‘আপসহীন নেত্রী’। ১৯৮৬ সালে অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে অনড় থেকে নির্বাচন বর্জন করেন।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ইতিহাস গড়েন। তাঁর বড় কৃতিত্ব ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বদলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ পুনঃপ্রবর্তন করা। গুগল এনালাইসিস ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটনের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ, সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি.ভি নরসিমা রাওয়ের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এছাড়া চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন থেকেই তাঁর সাথে খালেদা জিয়ার এক গভীর কূটনৈতিক সখ্য গড়ে উঠেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিশাল পরিবর্তন আসে, ২০২৫ সালের আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই পরিবর্তনের মাঝেও খালেদা জিয়ার আদর্শ ও জনপ্রিয়তার এক বড় প্রভাব দৃশ্যমান। দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা কাটিয়ে তিনি যখন মুক্ত পরিবেশে ছিলেন, তখনই তাঁর চিরবিদায়ের খবরটি সারা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বাদ জোহর বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বেগম জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় ইমামতি করবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক।
জানাজার নিরাপত্তায় মাঠে থাকবে ১০ হাজার পুলিশ সদস্য।
জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জিয়া উদ্যানে স্বামী জিয়াউর রহমানের পাশে তাঁকে সমাহিত করা করা হবে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে জানাজায় বড় ব্যাগ বা কোনো দাহ্য পদার্থ বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন তাঁর শোকবার্তায় খালেদা জিয়াকে ‘চীনের অকৃত্রিম বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার জানাজায় অংশ নিতে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকা আসছেন। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জনপ্রিয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোক প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবর্তক হিসেবে পোশাক শিল্পের বিকাশে তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আগামীকাল বুধবার দেশের সব তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে বিজিএমইএ। সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, "১৯৫০-এর যে অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, খালেদা জিয়া তা নব্বইয়ের দশকে বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করেছিলেন।"
১৯৫০ থেকে ২০২৫—এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ অনেক বাধা অতিক্রম করেছে। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটেই নয়, বরং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়েছেন। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর শেষ বিদায়ের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিস্মরণীয় যুগের।
তথ্যসূত্র: ১. বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫)। ২. গুগল নিউজ কূটনৈতিক ডেস্ক, বিজিএমইএ-র শোক বিজ্ঞপ্তি এবং পাকিস্তান ও চীনা দূতাবাসের শোকবার্তা। ৩. সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর গ্রন্থ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন আর্কাইভ (১৯৫০-২০২৫)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |