ধ্বংসস্তূপ থেকে হিজবুল্লাহর ফিনিক্স উত্থান: ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতি ও নতুন সমরকৌশল
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বৈরুত ও ঢাকা: গত এক বছর ধরে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং এমনকি লেবাননের সরকারও দাবি করে আসছিল যে, হিজবুল্লাহ চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চের এই রণক্ষেত্র ভিন্ন কথা বলছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর নিখুঁত ড্রোন হামলা এবং দক্ষিণ ইসরায়েল পর্যন্ত রকেট নিক্ষেপ প্রমাণ করছে যে—যাকে 'কৌশলগত পতন' ভাবা হয়েছিল, তা ছিল আসলে হিজবুল্লাহর এক সুপরিকল্পিত 'কৌশলগত বিরতি'।
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে অর্থাৎ ১৯০০ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে ধারা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক নতুন ও আধুনিক রূপ নিয়েছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহর জন্ম—প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল টিকে থাকার লড়াই।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন যে, হিজবুল্লাহ 'কয়েক দশক' পিছিয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে, হিজবুল্লাহ সেই ১৫ মাসের বিরতিকে যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং 'পুনর্গঠন' ও 'মুগনিয়া চেতনা'য় ফিরে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করেছে।
হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্রমতে, যুদ্ধবিরতির ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর থেকেই তাদের পুনর্গঠন শুরু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ সামরিক কমান্ডাররা তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে রিপোর্ট করেন— ‘মিশন সফল’। যদিও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো কিছু কৌশলগত ক্ষতি অপূরণীয় ছিল, তবুও তারা তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং রকেট মজুতকে ২০২৩ সালের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পেজার বিস্ফোরণ এবং হাসান নাসরুল্লাহসহ শীর্ষ নেতৃত্বের শাহাদাতের পর হিজবুল্লাহকে 'অন্ধ ও বিচ্ছিন্ন' মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ফ্রন্টলাইনে থাকা 'জীবন্ত শহীদ' বা নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধাদের আমৃত্যু লড়াই সংগঠনের অবশিষ্ট নেতাদের শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে হিজবুল্লাহ এখন তাদের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বর্জন করে 'মৌলিক ও আদিম' পদ্ধতিতে ফিরে গেছে। মানুষের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো এবং হাতে লেখা চিরকুটের মাধ্যমে তারা এখন যোগাযোগ রক্ষা করছে। বড় এবং ভারী সেনাবাহিনীর মডেল ছেড়ে তারা এখন প্রখ্যাত কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়ার সেই 'আধা-স্বায়ত্তশাসিত ক্ষুদ্র ইউনিট' মডেলে ফিরে গেছে, যা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
কাগজে-কলমে লিতানি নদীর দক্ষিণে হিজবুল্লাহর উপস্থিতি না থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে তারা ছদ্মবেশে এবং ছোট ছোট সেলের মাধ্যমে সেখানে পুনরায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের সময় তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্র ডিপোগুলো খালি করে লেবাননে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া নতুন দফায় হিজবুল্লাহ প্রতিদিন ৬০টিরও বেশি ড্রোন ও রকেট নিক্ষেপ করছে। এমনকি আশকেলন এবং গাজা উপত্যকার নিকটবর্তী ইসরায়েলি জনপদেও পৌঁছে গেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯০০ সালের সেই পুরনো প্রতিরোধ কৌশল থেকে ২০২৬ সালের ড্রোন যুদ্ধের এই আধুনিকায়ন প্রমাণ করে যে, হিজবুল্লাহ কেবল একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং একটি আদর্শিক শক্তি। তাদের সাবেক মিডিয়া প্রধান মোহাম্মদ আফিফ যেমনটা বলতেন— ‘হিজবুল্লাহ কেবল একটি দল নয়, এটি একটি জাতি; আর জাতির মৃত্যু হয় না।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, আল-জাজিরা, রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ কেন্দ্র।
বিশ্লেষণ: বিগত এক শতাব্দীর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো গোষ্ঠী এত দ্রুত পুনর্গঠিত হতে পারেনি। ইসরায়েলের ভুল মূল্যায়ন এবং হিজবুল্লাহর 'ছদ্মবেশী' পুনর্গঠন ২০২৬ সালের এই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য হিজবুল্লাহ এখন আর কেবল 'দুর্বল' শত্রু নয়, বরং এক নতুন ও শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ।
সুত্র: মিডল ইস্ট আই এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |