ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা কমেডির কিংবদন্তি
‘আই অ্যাম কমিউনিস্ট, আই বিয়ার ইট ইন মাই নেম।’ বাংলার মঞ্চ ও চলচ্চিত্র জগতে কৌতুক ও রসাভিনয়ে যার নাম সবার আগে মনে আসে, তিনি হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পোশাকি নাম ছিল ‘সাম্যময়’। নিজের নাম নিয়েও তিনি রসিকতা করতেন, এবং প্রথম বাক্যটি পড়লেই অনেকেই বুঝে ফেলেন তার অনবদ্য রসবোধ।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শুরুতে ‘ভানুসিংহ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। তবে আজকের আলোচনা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যতিক্রমী কমেডি এবং চলচ্চিত্র জগতে তার অবদানের ওপর। ভানু মূলত ঢাকার সন্তান ছিলেন। ১৯৪১ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে এক পরিচিতজনের গাড়ির পেছনের সিটে শুয়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। কিন্তু তার মন ছিল ঢাকাতেই। স্মৃতিময় ঢাকাকে তিনি কখনও ভুলতে পারেননি, এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঢাকা তাকে ভাবাত।
১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তার অবদান আজও মানুষের মনে জীবন্ত। ষাটের দশকে বাংলা সিনেমায় ‘উত্তম কুমার-সুচিত্রা সেন’ জুটির মতো ‘ভানু-জহর রায়’ জুটিও যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। তাদের মঞ্চে থাকা, স্ক্রিনে অভিনয় করা, হাস্যরসে ভরপুর সংলাপ তাদের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিল।
ভানু একবার সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনেন এবং তার বন্ধু জহর রায় সেই গাড়ি কেনার সেলিব্রেশন করেন। এতে তিনি বলেন, ‘ভানু গাড়ি কিনেছে কমেডির টাকা দিয়ে, এ গাড়ি ওর একার নয়, সকল কমেডিয়ানের।’ এভাবে বন্ধুত্বের নির্মল সম্পর্ক ছিল তাদের মধ্যে, যা চলচ্চিত্রের বাইরে তাদের জীবনে রূপায়িত হয়েছিল।
ভানু তার অভিনয়কে কখনো ভাঁড়ামি মনে করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হাসানোর জন্য নিখুঁত টাইমিং, অঙ্গভঙ্গি এবং সঠিক সংলাপ ব্যবহার করা উচিত। তার অঙ্গভঙ্গি, বাচনভঙ্গি এবং টাইমিং দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলত। এক কথায়, ভানু কমেডিকে একটি শিল্পে রূপান্তরিত করেছিলেন।
ভানুর অভিনীত অসংখ্য সিনেমার মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ছিল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। এই সিনেমায় ঢাকার কুট্টি একসেন্টে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। এছাড়া, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভানু পেল লটারি’, ‘পার্সোনাল এ্যাসিস্ট্যান্ট’ ইত্যাদি ছবির অভিনয়ও ছিল তার অভিনয়ের আরেকটি দিক। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ও ‘স্বর্গ মর্ত্য’-এর মতো দুর্বিনীত কনসেপ্টের সিনেমাগুলোর অভিনয় আজও মানুষকে অবাক করে দেয়।
ভানুর শেষ বয়সেও তার অভিনয়ের জাদু ছিল অপরিসীম। ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘৮০ তে আসিও না’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর এ্যাসিস্ট্যান্ট’-এ তার অভিনয় ছিল সহজাত এবং অদ্বিতীয়। তার নামে দু’টি সিনেমার টাইটেল হয়েছিল, যা তখনকার যুগে ছিল একটি বিরল ঘটনা।
১৯৫৯ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’ সিনেমায় অভিনয় করে ভানু যেন সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন। তার হাস্যরস ও সিরিয়াসনেসের সমন্বয়ে সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়। সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে চ্যাপলিনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, তবে ভানু তা নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছিলেন।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক, অভিনয়, এবং সৃজনশীলতার মিশ্রণ তাকে বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি করে তোলে। তার কমেডি এক নতুন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে, যা আজও দর্শকদের মনে অমর হয়ে আছে।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |