যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন, তার মেয়াদ ফুরিয়ে আসায় সেটি আরও বাড়ানো যায় কিনা—তা নিয়ে বর্তমানে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ট্রাম্পের দেওয়া দুটি মূল শর্তে ইরান এখনও একমত হতে না পারায় চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি আটকে আছে।
চলমান এই আন্তর্জাতিক সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যকার রেষারেষির মূল বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে স্থায়ী চুক্তির পথ সুগম করতে ইরান একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘সিচুয়েশন রুমে’ (Situation Room) প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। তবে বৈঠক থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এসেছে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এবং স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে মূলত দুটি কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে:
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার: ট্রাম্পের প্রথম শর্ত হলো—হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে, অবিলম্বে প্রণালীটি উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেখানে যুদ্ধের আগের পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এছাড়া সেখান দিয়ে চলাচলের জন্য কোনো শুল্ক বা টোল আদায় করা যাবে না।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ বন্ধ: দ্বিতীয় এবং অপরিবর্তনীয় শর্ত হলো—ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সুযোগ রাখা যাবে না। ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, "ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমা বানাতে পারবে না—এ বিষয়ে তাদের সম্মত হতেই হবে।" এমনকি ইরান থেকে মাটি খুঁড়ে পারমাণবিক সামগ্রী বের করে আনার দাবিও করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা শর্তের মুখে তেহরান এখন পর্যন্ত কোনোটিতেই রাজি হয়নি এবং তাদের নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধে ‘জয়’ দেখানোর চেষ্টা: ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স দাবি করেছে যে, ট্রাম্পের এই ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য মূলত বিশ্ববাসীর কাছে যুদ্ধে নিজের ‘জয়’ দেখানোর একটি রাজনৈতিক চেষ্টা মাত্র।
হরমুজ প্রণালীর সার্বভৌমত্ব: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের নিয়ন্ত্রণ কেবল ইরান ও ওমানের হাতে থাকা উচিত। অন্য কোনো বিদেশি শক্তির এখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি: তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানি জাহাজের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তা সম্পূর্ণ না উঠলে এই প্রণালী কোনোভাবেই খুলে দেওয়া হবে না।
চলমান এই অচলাবস্থার মধ্যে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একটি সম্ভাব্য সমঝোতার সূত্র ইঙ্গিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী থেকে তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রও তার বিনিময়ে ধীরে ধীরে ইরানি জাহাজের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করা শুরু করবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই পক্ষ নিজেদের দাবিতে অনড় থাকে নাকি আলোচনার টেবিলে কিছুটা ছাড় দিতে রাজি হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তি।
আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: একজন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি মনে করি, ট্রাম্প এবং তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি 'ব্লিঙ্ক গেম' (Blink Game)। ট্রাম্প তাঁর চিরপরিচিত 'ডিল-মেকিং' স্টাইলে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করছেন, যেখানে তিনি ইরানকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র এবং হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন মিত্রদের জন্য উন্মুক্ত দেখতে চান। অন্যদিকে ইরান ভালো করেই জানে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র (Leverage)। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অবরোধ প্রত্যাহারের ইঙ্গিতটি প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে একটি মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। তবে ইরান তাদের পারমাণবিক সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত না করে ট্রাম্পের এই অপমানজনক শর্তে সই করবে বলে মনে হয় না। আগামী কয়েক দিন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |