| বঙ্গাব্দ

ওবামা বনাম ট্রাম্পের ইরান চুক্তি; দুই চুক্তির আকাশ-পাতাল তফাত

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 19-06-2026 ইং
  • 16084 বার পঠিত
ওবামা বনাম ট্রাম্পের ইরান চুক্তি; দুই চুক্তির আকাশ-পাতাল তফাত
ছবির ক্যাপশন: ওবামা বনাম ট্রাম্পের ইরান চুক্তি

১৬০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত দলিল বনাম দেড় পৃষ্ঠার রূপরেখা; মার্কিন-ইরান দুই চুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে তার করা বর্তমান চুক্তিটি ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঐতিহাসিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও কার্যকর। তবে ট্রাম্পের এই আত্মতুষ্টির দাবিকে পুরোপুরি খণ্ডন করে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন মার্কিন বিরোধীরা। তাদের পরিষ্কার অভিযোগ—ওবামার তুলনায় ট্রাম্প বরং ইরানকে অনেক বেশি অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন, যার বিনিময়ে আমেরিকার কৌশলগত অর্জন খুবই সামান্য।

বাস্তবে ওবামার ‘জেসিপিওএ’ (JCPOA) এবং ট্রাম্পের বর্তমান সমঝোতা স্মারকের (MOU) তুলনা করলে দেখা যায়, কৌশল ও শর্তের দিক থেকে এ দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে।

চূড়ান্ত দলিল বনাম দেড় পৃষ্ঠার রূপরেখা

  • ওবামার চুক্তি (২০১৫): বারাক ওবামার চুক্তিটি ছিল একটি সম্পূর্ণ চূড়ান্ত, আইনি এবং বিস্তারিত দলিল, যা ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) নামে পরিচিত। ১৬০ পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ ও জটিল সেই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে একতরফাভাবে বাতিল করেন।

  • ট্রাম্পের চুক্তি (২০২৬): বিপরীতে, ট্রাম্পের বর্তমান ‘সমঝোতা স্মারক’ কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী চুক্তি নয়। এটি মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটি ১৪-দফা রূপরেখা বা খসড়া মাত্র, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর তড়িঘড়ি তৈরি হয়েছে। গত চার মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়নে এটি কেবল ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো মূল জটিলতাগুলো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

বহুপাক্ষিক বনাম দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি

  • ওবামার বহুপাক্ষিক জোট: ওবামা প্রশাসনের কূটনীতি ছিল বহুপাক্ষিক। তিনি প্রায় দুই বছর ধরে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি—চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (P5+1) সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই চুক্তি করেছিলেন।

  • ট্রাম্পের দ্বিপাক্ষিক পথ: বিপরীতে, ট্রাম্প হেঁটেছেন সম্পূর্ণ একলা চলো বা দ্বিপাক্ষিক পথে। এখানে কোনো আন্তর্জাতিক মিত্রকে না রেখে আলোচনাকে কেবল প্রত্যক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন

উভয় চুক্তিতেই ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেও এর গভীরতায় বড় পার্থক্য রয়েছে:

  • ওবামার কঠোর নিয়ন্ত্রণ: ওবামার চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর অত্যন্ত কঠোর ও নিখুঁত সীমাবদ্ধতা ছিল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) সার্বক্ষণিক পরিদর্শনের মাধ্যমে ট্রাম্পের চুক্তি বাতিলের আগে পর্যন্ত ইরান যে নিয়ম মানছে, তা নিশ্চিত করেছিল। এতে কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের স্থায়ী আইনি ব্যবস্থা ছিল।

  • ট্রাম্পের শিথিল রূপরেখা: ট্রাম্পের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের একটি সাধারণ পথ দেখায়, কিন্তু ৬০ দিনের আলোচনার বাইরে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি এতে নেই। এমনকি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের (IAEA Inspection) বিষয়েও এই দেড় পৃষ্ঠার দলিলে সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। যদিও ইরান তাদের উচ্চ-মাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুদ প্রত্যন্ত অঞ্চলে আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করার একটি মৌখিক ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি পরবর্তী আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা, ফ্রিজ করা তহবিল ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিতর্ক

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও দুটি চুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে:

  • ওবামার ‘যাচাই সাপেক্ষে’ নীতি: ওবামা প্রশাসন সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং ইরানের প্রতিটি পারমাণবিক পদক্ষেপ মাঠ পর্যায়ে শতভাগ যাচাই করার পর অত্যন্ত ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল।

  • ট্রাম্পের ‘অগ্রিম ছাড়’ নীতি: কিন্তু ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারকে শুরুতেই ইরানকে বড় ধরণের অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইরান চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই অবিলম্বে তেল রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার পথও এটি উন্মুক্ত করেছে।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠনের কথা বলেছে, যার শর্তাবলি এখনো সম্পূর্ণ ধোঁয়াশায় ঘেরা। অতীতে ওবামা প্রশাসন ১৯৮১ সাল থেকে আটকে থাকা মাত্র ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল ফেরত দেওয়ায় ট্রাম্প ওবামার তীব্র সমালোচনা ও 'দেশদ্রোহী' আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ এখন ট্রাম্প নিজে ইরানকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ও তহবিল পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন—যা ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীদের মধ্যেও চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালি সংকট

  • ওবামার একক ফোকাস: ওবামার চুক্তির মূল ফোকাস ছিল কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর। ওবামা প্রশাসন মনে করেছিল, এর সাথে অন্য আঞ্চলিক বা ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলো যুক্ত করলে মূল চুক্তিটিই ভেস্তে যাবে।

  • ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন সমঝোতা: অন্যদিকে, ট্রাম্প ও ইসরাইলের শুরু করা চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে যে বড় ধাক্কা লেগেছে, তা থামানোর একটি কৌশলগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সমঝোতা স্মারক। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইরানের বন্ধ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় চালু করা। তবে যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়েও এই প্রণালিতে এবার নিজেদের একচেটিয়া বেশি নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে ইরান, যা আগামী দিনের চূড়ান্ত আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এক নজরে ওবামা বনাম ট্রাম্পের ইরান চুক্তি

তুলনামূলক সূচকওবামার চুক্তি (২০১৫)ট্রাম্পের চুক্তি (২০২৬)
চুক্তির ধরণ ও দৈর্ঘ্যচূড়ান্ত চুক্তি, ১৬০ পৃষ্ঠার বিস্তারিত দলিল।অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক, ১.৫ পৃষ্ঠার রূপরেখা।
কূটনৈতিক কৌশলবহুপাক্ষিক (চীন, রাশিয়া, ইইউ ও ব্রিটেনসহ)।সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক (কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান)।
অর্থনৈতিক সুবিধাপদক্ষেপ যাচাই সাপেক্ষে ধাপে ধাপে তহবিল মুক্তি।অবিলম্বে তেল রপ্তানি ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত তহবিল।
পরিদর্শন ব্যবস্থাআইএইএ (IAEA)-এর কঠোর ও নিয়মিত আন্তর্জাতিক পরিদর্শন।ভবিষ্যতে পরিদর্শনের কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই।
আঞ্চলিক ইস্যুহরমুজ প্রণালি বা আঞ্চলিক যুদ্ধ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না।৪ মাসের যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি চালু করাই মূল লক্ষ্য।

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির আরও খবরের জন্য ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency