| বঙ্গাব্দ

অযোধ্যার রাম মন্দিরে কোটি কোটি রুপি চুরি, চম্পত রাইয়ের পদত্যাগ

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-06-2026 ইং
  • 2560 বার পঠিত
অযোধ্যার রাম মন্দিরে কোটি কোটি রুপি চুরি, চম্পত রাইয়ের পদত্যাগ
ছবির ক্যাপশন: অযোধ্যার রাম মন্দির

দানবাক্স থেকে কোটি কোটি রুপি আত্মসাৎ! নৈতিক দায়ে রাম মন্দির ট্রাস্টের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার পদত্যাগ

আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় কূটনীতি ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬

ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় সদ্য নির্মিত ঐতিহাসিক রাম মন্দিরের অফিশিয়াল দানবাক্স থেকে কোটি কোটি রুপি এবং ভক্তদের দেওয়া মূল্যবান সোনা-দানা সুপরিকল্পিতভাবে আত্মসাতের ঘটনায় এক চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক নতুন তথ্য সামনে এনেছে বিশেষ তদন্ত দল (SIT)। এসআইটির অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্দিরের নগদ অর্থ গণনার দায়িত্বে থাকা ভেতরের একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করে এবং চুরি করা বিপুল পরিমাণ রুপি প্রথমে মন্দিরের ভেতরের টয়লেটে (শৌচাগার) লুকিয়ে রেখে পরে নিখুঁত উপায়ে বাইরে পাচার করত।

এদিকে এই মহা চুরির কেলেঙ্কারি ও তদন্তের অগ্রগতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাতে চরম নৈতিক দায় স্বীকার করে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের প্রধান দুই শীর্ষ কর্মকর্তা চম্পত রাই (Champat Rai) এবং অনিল মিশ্র (Anil Mishra) তাঁদের স্ব-স্ব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এই স্পর্শকাতর মামলায় ইতিমধ্যে গ্রেফতার হওয়া আটজন (৮) মূল অভিযুক্তকে রিমান্ডে নিয়ে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।

যেভাবে ধরা পড়ল ৫০০ রুপির নোটের জালিয়াতি

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV) ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বিশেষ সূত্রের বরাতে জানা যায়, মন্দিরের কয়েক ডজন দানবাক্স খালি করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থের মূল হিসাব ও অডিট পর্যালোচনা করতে গিয়ে প্রথমে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি ট্রাস্টের নজরে আসে। সাধারণত মন্দিরের প্রতিটি দানবাক্সে গড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ রুপি থাকার কথা থাকলেও, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ৫০০ রুপির নতুন নোটের বান্ডিলগুলোতে রহস্যজনক ঘাটতি ধরা পড়তে থাকে।

এরপর ট্রাস্টের সন্দেহের ভিত্তিতে অর্থ গণনার বিশেষ স্ট্রং রুমে অত্যন্ত গোপনে কিছু ‘স্পাই ক্যামেরা’ বা গোপন ক্যামেরা বসানো হয়। সেই ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, অর্থ গণনাকারী দলের একজন কর্মী ইচ্ছাকৃতভাবে মূল সিসিটিভি ক্যামেরার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীর দিয়ে লেন্সের দৃশ্য আড়াল করতেন। আর ঠিক সেই সুযোগে তাঁর পিছনে থাকা মূল সহযোগী নোটের বড় বড় বান্ডিল থেকে থোকা থোকা টাকা বের করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজের বিশেষ পোশাকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতেন।

ব্যাংকের ভাউচার জালিয়াতি ও টয়লেট সিন্ডিকেট

এসআইটির প্রতিবেদনে অর্থ আত্মসাতের আরেকটি চতুর কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্তরা ব্যাংকে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা নোটের মূল বান্ডিলে অতিরিক্ত কিছু নোট জোর করে ঢুকিয়ে রাখতেন। পরে শুধু বান্ডিলের মোট সংখ্যা গুনে ভাউচার তৈরি করা হতো। কিন্তু ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে অর্থ পাঠানোর ঠিক আগ মুহূর্তে সেই অতিরিক্ত ও হিসাব বহির্ভূত নোটগুলো কৌশলে সরিয়ে নেওয়া হতো। ফলে কাগজে-কলমে ও ভাউচারের হিসাবে সবকিছু ঠিকঠাক দেখালেও, বাস্তবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ অবলীলায় গায়েব করে দেওয়া সম্ভব হতো।

তদন্তে আরও জানা গেছে, স্ট্রং রুম থেকে সরানো এই অবৈধ অর্থ প্রথমে মন্দির চত্বরে অবস্থিত সাধারণ ও ভিআইপি টয়লেটের ফলস সিলিং ও কমোডের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হতো। পরে ডিউটি শেষ হওয়ার সুযোগ বুঝে কিংবা আবর্জনা পরিষ্কারের বাহানায় তা মন্দির প্রাঙ্গণের বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং শহরের অন্য একটি নিরাপদ স্থানে বসে পুরো চক্রের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করা হতো।

ভিডিও ও সিসিটিভি রেকর্ড: তদন্তকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে জাঁকজমকপূর্ণভাবে মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই এই চোর চক্রটি ভেতরে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। এসআইটির অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল থেকে ৫ জুন পর্যন্ত সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্তত ৭০টি (70 Times) সরাসরি চুরির ঘটনা হাতেনাতে শনাক্ত করা হয়েছে।

সুপারিশের চাকরি ও সোনার গয়না গায়েব

এই মেগা চুরির ঘটনায় ভারতের কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং উত্তরপ্রদেশ সরকারের কয়েকজন কর্মচারীর নামও তদন্তে উঠে এসেছে। বিভিন্ন বেসরকারি অডিট প্রতিবেদনে ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি রুপি আত্মসাতের দাবি করা হলেও, এখনো পর্যন্ত রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতির চূড়ান্ত সরকারি অঙ্ক জানানো হয়নি। তবে এ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে প্রায় ৭০ লাখ নগদ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তদন্তকারীদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে।

এসআইটির প্রতিবেদনে মূল আট অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এরা হলেন— অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লাভকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পান্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং চম্পত রায়ের সাবেক চালক রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদব। তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্তদের অনেকেই ট্রাস্টের বড় কর্তাদের সুপারিশের মাধ্যমে এই সংবেদনশীল চাকরি পেয়েছিলেন। শুধু নগদ অর্থই নয়, রামলালার (শিশু রাম) জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তদের উৎসর্গ করা সোনার কানের দুল, দামি নাকফুল, সোনার চুড়ি, হীরার আংটি এবং রুপার নূপুরও এই চক্রটি পাচার করে দিয়েছে।

রিপোর্টে তিন্নু যাদব ও সুভাষ শ্রীবাস্তবকে পুরো চোর সিন্ডিকেটের মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গত তিন বছরের অভ্যন্তরীণ অডিট পর্যালোচনা করে মন্দিরের অপর্যাপ্ত সিসিটিভি নজরদারি, দায়িত্ব শেষে কর্মীদের মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে বডি সার্চ বা শরীর তল্লাশি না করা এবং তদারকির ক্ষেত্রে চরম জবাবদিহির অভাবের মতো মারাত্মক নিরাপত্তা গাফিলতির বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছে এসআইটি।

এক নজরে অযোধ্যা রাম মন্দিরের মেগা চুরি কেলেঙ্কারি (জুন, ২০২৬)

  • মূল ঘটনা: মন্দিরের দানবাক্স ও স্ট্রং রুম থেকে কোটি কোটি রুপি ও স্বর্ণালংকার সুপরিকল্পিতভাবে চুরি।

  • হাই-প্রোফাইল পদত্যাগ: নৈতিক দায় নিয়ে ট্রাস্টের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা চম্পত রাই ও অনিল মিশ্রের পদত্যাগ।

  • চুরির অভিনব কৌশল: সিসিটিভি ক্যামেরা আড়াল করে টাকা চুরি এবং তা প্রথমে মন্দিরের টয়লেটে লুকিয়ে রাখা।

  • চক্রের মূল হোতা: ট্রাস্টের সাবেক প্রশাসনিক কর্মী তিন্নু যাদব ও অর্থ গণনাকারী সুভাষ শ্রীবাস্তব।

  • রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ১৯৯২ সালে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্মিত এই রাম মন্দির ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির (BJP) অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও আবেগীয় স্তম্ভ।


বিশেষ প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

অযোধ্যার রাম জন্মভূমি ট্রাস্টের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির তালিকা, উত্তরপ্রদেশ পুলিশের (UP Police) এসআইটি রিপোর্টের চূড়ান্ত চার্জশিট, ভারতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনের সব এক্সক্লুসিভ আন্তর্জাতিক ব্রেকিং নিউজের দ্রুত ও নিখুঁত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency