আন্তর্জাতিক ও ওয়াশিংটন ব্যুরো | বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও কুখ্যাত ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ (Watergate Scandal)-কে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন ও সাধারণ একটি ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে এক চরম বিস্ফোরক ও বিতর্কিত দাবি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance)। তাঁর দাবি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে কোনো আইনি অপরাধের কারণে নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের পর্দার আড়ালের শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক চক্র বা ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) সম্পূর্ণ অন্যায় ও চক্রান্তমূলকভাবে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি নিক্সনের সেই ট্র্যাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার হুবহু মিল খুঁজে দেখিয়েছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহ্যবাহী রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিয়ামে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) এক বিশেষ স্মারক বক্তৃতায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এসব কথা বলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে ৪১ বছর বয়সি এই রিপাবলিকান নেতা বলেন, "ওয়াটারগেটের মতো ঘটনা যদি আজ বা এই যুগে ঘটত, তাহলে এটি বড়জোর ১২ ঘণ্টার একটি সাধারণ সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকত এবং এরপর সবাই তা ভুলে যেত। সাধারণ আড়িপাতার মতো একটি ঘটনা একটি দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের পতনের মূল কারণ হতে পারত—আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এমন ধারণা করাটাই অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর।"
জেডি ভ্যান্সের এই ঐতিহাসিক মন্তব্য মার্কিন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে তীব্র বিতর্কের মুখেও ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের কার্যালয় তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা সাফাই দেয়নি।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে ওয়াশিংটনের বিখ্যাত ওয়াটারগেট কমপ্লেক্স ভবনে তৎকালীন বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির প্রধান কার্যালয়ে অবৈধভাবে আড়িপাতা এবং তথ্য চুরির এক ব্যর্থ চেষ্টা থেকে এই ঐতিহাসিক কেলেঙ্কারির সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে এফবিআই ও স্বাধীন তদন্তে উঠে আসে যে, প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন নিজে এই পুরো বেআইনি অপারেশনটি সম্পর্কে প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ও তদন্তকারীদের মুখ বন্ধ রাখতে হোয়াইট হাউস থেকে গোপনে অর্থ প্রদানের (Hush Money) সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার দীর্ঘ দুই বছর পর, অভিশংসন ও আইনি সাজার হাত থেকে বাঁচতে ১৯৭৪ সালে নিক্সন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের একক ক্ষমতাকে সীমিত করতে এবং সরকারি ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা জোরদারে একাধিক ঐতিহাসিক আইনি সংস্কার ও জবাবদিহিতা আনা হয়েছিল। তবে বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনি সংস্কারের সেসব ব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যত দুর্বল ও অকার্যকর করে দিয়েছে বলে শুরু থেকেই সমালোচকদের তীব্র অভিযোগ রয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের এই পক্ষপাতমূলক বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিমোথি নাফতালি (Timothy Naftali)। তিনি ভ্যান্সের দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, "রিচার্ড নিক্সনের ওভাল অফিসে রেকর্ড করা সেই ঐতিহাসিক অডিও টেপগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখা ও শোনা গেছে, তিনি কীভাবে তাঁর অধীনস্থদের এবং মামলার মূল সাক্ষীদের আদালতে প্রকাশ্য মিথ্যা বলতে উত্সাহ দিয়েছেন এবং তদন্ত সংস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। এটি কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা ডিপ স্টেটের চক্রান্তের বিষয় নয়। নিক্সনের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংবিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ শতভাগ শক্তিশালী ও অকাট্য।"
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কট্টর রক্ষণশীল ও ডানপন্থী মহল ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (MAGA) আন্দোলনের হাওয়া ধরে দাবি করে আসছে যে, সরকারি অতি-আমলাতন্ত্র এবং মূলধারার ডেমোক্র্যাটপন্থী গণমাধ্যম (Mainstream Media) নিক্সনকে অন্যায়ভাবে টার্গেট করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
রিচার্ড নিক্সন লাইব্রেরির বক্তৃতায় ভ্যান্স হোয়াইট হাউসের সাবেক কিংবদন্তি নিক্সনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিলের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে নিক্সন যেভাবে শক্ত ও কৌশলী অবস্থান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছিলেন, ঠিক একইভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পর অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত হতে দেননি।"
ভ্যান্স আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, "নব্বইয়ের দশকে ডিপ স্টেট যেভাবে রিচার্ড নিক্সনকে চক্রান্ত করে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল, ঠিক একই গোষ্ঠী, একই মিডিয়া ও একই প্রতিষ্ঠানগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রথম প্রশাসনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের নোংরা জুডিশিয়াল ক্যু বা চেষ্টা চালিয়েছিল। এখানে দুই প্রেসিডেন্টের ভাগ্যের স্পষ্ট মিল রয়েছে।"
তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের দীর্ঘ তদন্ত এবং নিক্সনের বিরুদ্ধে চলা তৎকালীন অভিশংসন (Impeachment) প্রক্রিয়ারও তুলনা করেন। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ডেমোক্র্যাটদের দ্বারা দুবার প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটের শুনানিতে দোষী সাব্যস্ত হননি। অন্যদিকে, নিক্সন চূড়ান্ত অভিশংসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত জেনেই পদত্যাগ করেন এবং পরে তাঁর উত্তরসূরি প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড তাঁকে বিশেষ রাষ্ট্রপতির ক্ষমা (Presidential Pardon) প্রদান করেন।
বক্তৃতার শেষাংশে ৪১ বছর বয়সি জেডি ভ্যান্স ট্রাম্পের পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের সাথেও নিক্সনের কিছু চমকপ্রদ মিল টানেন। অত্যন্ত রসিকতার সুরে তিনি বলেন, "একজন তরুণ মার্কিন সিনেটর, পরে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার বইয়ের লেখক এবং মূলধারার গণমাধ্যমের চরম অপছন্দের ব্যক্তি—শুনতে এবং মেলাতে গেলে এটি অনেকটাই জেডি ভ্যান্সের নিজের জীবনীর মতো শোনায়। তাই আমি সবসময়ই ব্যক্তিগতভাবে রিচার্ড নিক্সনকে বেশ পছন্দ করে এসেছি।"
মূল বক্তব্য: ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিকে ‘তুচ্ছ ঘটনা’ আখ্যা দিয়ে রিচার্ড নিক্সনকে ‘ডিপ স্টেট’-এর শিকার বলে দাবি।
বক্তব্যস্থল: ক্যালিফোর্নিয়ার রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি অ্যান্ড মিউজিয়াম (বৃহস্পতিবার)।
ট্রাম্পের সাথে তুলনা: নিক্সনকে যেভাবে সরানো হয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও একই প্রতিষ্ঠানগুলো সরানোর চেষ্টা করেছে।
ইতিহাসের সত্যতা: ১৯৭৪ সালে আড়িপাতা ও তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার দায়ে অভিশংসনের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন নিক্সন।
ঐতিহাসিকদের ক্ষোভ: কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক টিমোথি নাফতালির মতে—নিক্সনের অপরাধের অডিও প্রমাণ অকাট্য, এটি কোনো চক্রান্ত নয়।
বিশেষ ওয়াশিংটন প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
হোয়াইট হাউসের দৈনিক প্রেস ব্রিফিংয়ের লাইভ আপডেট, মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটের সর্বশেষ রাজনৈতিক বিল পাস, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স প্রশাসনের নতুন অভ্যন্তরীণ নীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপডেটের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |