নিজস্ব প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলামি পরিভাষায় ‘বায়াত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের নাম। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং ইসলামের বিধান অনুসরণে নিজেকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেন। আরবি ‘বাইউন’ শব্দ থেকে ‘বায়াত’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ চুক্তি, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি।
কুরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে সাহাবিদের বায়াতের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। সুরা আল-ফাতহের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা রাসুলের কাছে বায়াত গ্রহণ করে, তারা মূলত আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহণ করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বায়াতে আকাবা। মদিনার আনসারদের সঙ্গে মক্কার কাছে আকাবা নামক স্থানে সংঘটিত ঐতিহাসিক এই অঙ্গীকার ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে মদিনায় মুসলমানদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং পরবর্তী হিজরতের পথ সুগম হয়।
বায়াতে আকাবা দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম বায়াতে অংশগ্রহণকারীরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, চুরি ও ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা, সন্তান হত্যা না করা, মিথ্যা অপবাদ না দেওয়া এবং সৎকাজে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবাধ্য না হওয়ার অঙ্গীকার করেন।
পরবর্তী বছর দ্বিতীয় বায়াতে আকাবায় মদিনার আরও বিপুলসংখ্যক মুসলমান অংশ নেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিপদের সময় নিজেদের পরিবার-পরিজনের মতো সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সুখে-দুঃখে তার নির্দেশ মান্য করার অঙ্গীকার করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বায়াত হলো বায়াতে রিদওয়ান। ষষ্ঠ হিজরিতে হুদাইবিয়ার প্রান্তরে এ বায়াত অনুষ্ঠিত হয়। মক্কায় হজরত ওসমান (রা.)-কে নিয়ে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দৃঢ় আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন।
এই বায়াতে অংশ নেওয়া সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা আল-ফাতহের ১৮ নম্বর আয়াতে গাছের নিচে সাহাবিদের বায়াতের প্রসঙ্গ তুলে তাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে।
হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই বায়াতের মূল বিষয় ছিল বিপদের সময় পিছু না হটা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অটল থাকা।
বায়াতের আরেকটি আলোচিত দিক হলো আমল ও তওবার অঙ্গীকার। এতে ব্যক্তি নিজের ভুল ও পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এবং ভবিষ্যতে শরিয়তসম্মত জীবনযাপনের দৃঢ় সংকল্প করেন। আত্মশুদ্ধি বা তাজকিয়ায়ে নফসের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বের কথা আলোচিত হয়েছে।
কুরআনে মুমিনদের আন্তরিক তওবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা আত-তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতে খাঁটি তওবার জন্য মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একইভাবে সুরা আল-মুমতাহিনার ১২ নম্বর আয়াতে মুমিন নারীদের বায়াতের ক্ষেত্রে শিরক, চুরি, ব্যভিচার, সন্তান হত্যা, মিথ্যা অপবাদ এবং সৎকাজে অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায়ও বায়াতের প্রসঙ্গ পাওয়া যায়। সাহাবিদের কাছ থেকে আল্লাহর সঙ্গে শরিক না করা, চুরি ও ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা এবং ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলার অঙ্গীকার নেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
তবে বায়াতের ক্ষেত্রে অন্ধ আনুগত্যের সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বা নেতার এমন নির্দেশ মানা যাবে না, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়। বায়াতের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে সংশোধন করা।
বায়াতের সমর্থকদের মতে, একজন যোগ্য দ্বীনি ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকলে আত্মশুদ্ধি ও তওবার ক্ষেত্রে ব্যক্তির মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে। অহংকার, হিংসা, রিয়া ও গিবতের মতো আত্মিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকার জন্য নিয়মিত আমল, জিকির ও সুন্নাহ অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আধুনিক জীবনে নানা ধরনের ব্যস্ততা ও প্রলোভনের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন ধরে রাখাকে কঠিন মনে করেন অনেকে। এ ক্ষেত্রে কোনো যোগ্য আলেম বা দ্বীনি পথপ্রদর্শকের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা ব্যক্তি জীবনে শৃঙ্খলা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
বায়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরিয়তের বিধান ও কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ। কোনো ব্যক্তি বা পীর-মুর্শিদের এমন নির্দেশ পালন করা বৈধ নয়, যা ইসলামের মৌলিক বিধানের বিরোধী।
হাদিসে এসেছে, আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল সৎ ও ন্যায়সংগত কাজের ক্ষেত্রে।
অতএব, বায়াতকে শুধু আনুষ্ঠানিক হাত ধরার বিষয় হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে যুক্ত আত্মশুদ্ধি, তওবা, নৈতিকতা ও আল্লাহর আনুগত্যের অঙ্গীকারকে গুরুত্ব দেওয়াই মূল বিষয়।
সূত্র: কুরআন, হাদিস ও ইসলামী ইতিহাসভিত্তিক তথ্য
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |