ইউরোপে সেনা উপস্থিতি কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্ররা
ইউরোপের কৌশলগত সামরিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন এনে ইউরোপীয় অঞ্চলে নিজস্ব সামরিক উপস্থিতি এবং সেনাসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের বিশ্বব্যাপী সামরিক পুনর্বিন্যাস কৌশলের (Global Force Posture) অংশ হিসেবে ইউরোপ মহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আমেরিকার নতুন এই সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের কৌশলগত পরিবর্তন ও এশিয়া-প্যাসিফিকে জোর
পেন্টাগন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতি-নির্ধারকদের বরাতে জানা গেছে, ইউরো-আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় শতভাগ সামরিক ব্যয় ও সেনা বহনের দায় যুক্তরাষ্ট্র আর একা কাঁধে নিতে রাজি নয়।
ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোকে এখন থেকে নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষার বড় অংশের দায়িত্ব নিজেদেরকেই নিতে হবে এবং সামরিক বাজেটে অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করতে হবে। বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করা এবং বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা কমানো হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জার্মানি, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়াসহ বিভিন্ন পূর্ব ইউরোপীয় দেশে অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাবহরের বড় একটি অংশ ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নেওয়া বা অন্য রুটে সরিয়ে নেওয়া হবে।
আমেরিকার এই সিদ্ধান্তের মূল প্রধান দিকসমূহ
পেন্টাগনের সামরিক পুনর্বিন্যাসের প্রধান নীতিগত কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস: ইউরোপীয় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ২ শতাংশের বেশি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া।
ইন্দো-প্যাসিফিকে বাড়তি নজর: চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি মোকাবিলায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মনোযোগ ও সেনা বাড়াতে ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে সামরিক বলয় কমানো।
ন্যাটো জোটের ওপর প্রভাব: ন্যাটোর (NATO) যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (EU) নিজস্ব ইউরোপীয় সেনাবাহিনী গঠনে বাধ্য করা।
এক নজরে ইউরোপে মার্কিন সেনা হ্রাস প্রক্রিয়া
| বিষয় | বিবরণ |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী | মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর (পেন্টাগন) ও ওয়াশিংটন প্রশাসন |
| প্রভাবিত অঞ্চল | জার্মানি, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও বিভিন্ন ন্যাটো ঘাঁটিক্যাম্প |
| মূল উদ্দেশ্য | ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোকে স্বাবলম্বী করা |
| ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া | গভীর উদ্বেগ ও ইউরোপ মহাদেশে নিরাপত্তার ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা |
ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপে চরম অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক সুরক্ষার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, তারা মনে করছে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পিছু হটার ফলে ইউরোপকে এখন নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্থান বৃদ্ধি করে নিজস্ব নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।