প্রতিবেদক: বুলবুল আহমেদ
মানব শরীরের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাইটাল অর্গান হলো লিভার বা যকৃৎ। আমাদের খাওয়া খাবার থেকে পুষ্টির সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ করা, রক্ত থেকে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থ ফিল্টার করে অপসারণ করা এবং চর্বি জাতীয় খাবার হজমের জন্য পিত্তরস (Bile) তৈরি করাসহ বহুবিধ অপরিহার্য কাজ পরিচালনা করে এই অঙ্গটি। অথচ বেশিরভাগ মানুষই লিভারের সমস্যা বা জটিলতা মারাত্মক পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো নিয়ে কোনো গুরুত্বই দেন না। তবে শরীরের কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সময়মতো খেয়াল করলে লিভারের সম্ভাব্য রোগ বা সমস্যার বিষয়ে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, প্রধানত চারটি বড় বিষয়—যেমন ত্বক ও চোখের রং, পেটের শারীরিক অবস্থা, মলত্যাগের ধরণ বা রঙে পরিবর্তন এবং প্রস্রাবের রঙের ভিন্নতা—লিভারের অসুস্থতার বড় সংকেত দিতে পারে। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
লিভারের যেকোনো সমস্যা বা রোগের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রাথমিক লক্ষণের একটি হলো জন্ডিস। এই অবস্থায় মানুষের শরীরের ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ অস্বাভাবিকভাবে হলুদ বর্ণ ধারণ করে। আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা ভাঙার ফলে ‘বিলিরুবিন’ নামক একটি বর্জ্য রঞ্জক পদার্থ তৈরি হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থ লিভার এই বিলিরুবিন সফলভাবে প্রক্রিয়াজাত করে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে জন্ডিসের মাধ্যমে।
করণীয়: ত্বক বা চোখের সাদা অংশ হলুদ দেখলে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ জন্ডিস শুধু লিভারের কারণে নয়, অন্য কোনো শারীরিক জটিলতার কারণেও হতে পারে।
পেটের ওপরের ডান দিকে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বস্তি কিংবা সবসময় পেট ভারী হয়ে থাকার অনুভূতি লিভার-সংক্রান্ত সমস্যার বড় লক্ষণ হতে পারে। লিভারে প্রদাহ বা ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যায় এমন অস্বস্তি দেখা দেয়। এছাড়া লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর ক্ষতির কারণে যখন রক্তপ্রবাহে চাপের পরিবর্তন ঘটে এবং শরীরে তরলের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, তখন পেটের ভেতরে অতিরিক্ত তরল বা পানি জমে পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ‘অ্যাসাইটিস’ (Ascites) বলা হয়।
করণীয়: পেটে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দিলে দ্রুত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
লিভার থেকে উৎপাদিত পিত্তরস আমাদের শরীরে চর্বি জাতীয় খাবার হজম করতে সরাসরি সহায়তা করে। তাই পিত্তরস তৈরি বা এর স্বাভাবিক প্রবাহে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে মলত্যাগের ধরণ এবং মলের রঙে স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।
মলের রঙ যদি স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত ফ্যাকাশে, ধূসর বা মাটির মতো হয়ে যায়, তবে তা পিত্তপ্রবাহে বাধার বড় লক্ষণ।
বিশেষ করে মলের এই পরিবর্তনের সঙ্গে যদি জন্ডিস বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব যুক্ত হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক।
এ ছাড়া কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ক্ষুধা কমে যাওয়া, খাবারের প্রতি তীব্র অনীহা এবং দ্রুত ওজন হ্রাস পাওয়াও লিভারের অসুস্থতার অন্যতম উপসর্গ।
শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রস্রাব কিছুটা হলুদ হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার পরও যদি প্রস্রাবের রং চা বা কোলার মতো গাঢ় বাদামি (Tea-colored urine) হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। লিভার বা পিত্তনালির রোগে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে তার একটি অংশ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে আসে, যার ফলে প্রস্রাবের রঙে এমন পরিবর্তন ঘটে।
করণীয়: চা-রঙের প্রস্রাবের সঙ্গে যদি চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া, ফ্যাকাশে মল কিংবা পেটে ব্যথার মতো লক্ষণগুলো মিলে যায়, তবে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
শরীরের উপরিউক্ত পরিবর্তনগুলো লিভারের সমস্যার প্রাথমিক সংকেত হতে পারে, তবে এগুলোকে কোনোভাবেই ঘরে বসে লিভার পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে ভাবা যাবে না। লিভারের প্রকৃত অবস্থা জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা (যেমন- SGPT, SGOT, Bilirubin) এবং আলট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় টেস্ট করাতে হবে।
সুষম জীবনযাপন: নিয়মিত সুষম খাবার খাওয়া, ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা লিভার ভালো রাখার মূল শর্ত।
ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা: চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ, পেইনকিলার বা ভেষজ উপাদান যত্রতত্র সেবন করা থেকে বিরত থাকুন।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধ: হেপাটাইটিসের ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ এবং যেকোনো ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত সহায়ক।
জন্ডিস, চা-রঙের প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল কিংবা পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া উপায়ে সমাধান খোঁজার চেষ্টা না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই লিভারের ক্ষতি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব।
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |