প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের দালিলিক প্রমাণ এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা পৈশাচিক ‘গুম সংস্কৃতি’র তদন্ত শেষে রোববার (৪ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। কমিশনের তথ্যমতে, এই অপরাধগুলো ছিল স্রেফ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এর সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন খোদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ১৯০০ সালের ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর রণাঙ্গন পর্যন্ত এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিশেষ করে বিগত ১৬ বছরে গণতন্ত্রের মুখোশ পরে যে পৈশাচিকতা চালানো হয়েছে, তা ১৯০০ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত এ অঞ্চলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস প্রতিবেদন গ্রহণকালে একে ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, "মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত বিভৎস হতে পারে—এটি তার ডকুমেন্টেশন।"
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস ও অন্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কমিশনের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল।
যাচাইকৃত গুম: ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘গুম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মিসিং অ্যান্ড ডেড: ২৮৭টি অভিযোগ এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃত সংখ্যা: কমিশন আশঙ্কা করছে, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে, কারণ অনেকেই ভয়ে বা অন্য দেশে থাকায় এখনো যোগাযোগ করেননি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, গুমের মূল লক্ষ্য ছিল বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করা।
জীবিত ফিরে আসা: গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রোফাইল: যারা এখনো ফেরেননি, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনাগুলোতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মতো ব্যক্তিদের গুম করার পেছনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সবুজ সংকেত ছিল। এমনকি অনেক ভুক্তভোগীকে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতে গোপনে হস্তান্তর বা ‘রেন্ডিশন’ করার প্রমাণও মিলেছে।
কমিশন তাদের তদন্তে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ ফেলার স্থানগুলো চিহ্নিত করেছে। তদন্ত অনুযায়ী, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুম করা হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জ এলাকায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ গুম করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে এই জায়গাগুলোকে ম্যাপিং করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে এই নৃশংসতার সাক্ষী মানুষ মনে রাখতে পারে।
ড. ইউনূস এই রিপোর্টগুলো সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, "জাতি হিসেবে এই পৈশাচিকতা থেকে আমাদের চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে।" কমিশন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের সুপারিশ করেছে। ২০২৪-এর বিপ্লব পরবর্তী ২০২৬-এর এই প্রতিবেদন কেবল বিচার নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের এক প্রধান সোপান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: ১. গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন (৪ জানুয়ারি ২০২৬)।
২. প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ও উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদের ব্রিফিং।
৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন জাতীয় সংবাদ আর্কাইভ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য (১৯৭১-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |