প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ডিজিটাল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন—এক দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি শোষণমুক্ত ও স্বচ্ছ রাষ্ট্র গড়া। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সংস্কার এবং ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশ এখন আধুনিকায়নের পথে এগোচ্ছে। তবে এই উন্নয়নের সমান্তরালে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের মেগা প্রকল্পগুলোর বিশাল ব্যয়ের বোঝা বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই। ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব এবং ১৯৬৬-এর ছয় দফা ছিল মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ সেই শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক। তবে গত দেড় দশকে উন্নয়নের নামে যে ‘মেগা প্রকল্প’ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা এখন রাষ্ট্রের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো এখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠগড়ায়।
দেশের বৃহত্তম প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হলেও এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতে একই প্রযুক্তির প্রকল্পের তুলনায় রূপপুরের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামীর এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ভারতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে ৫.৩৬ সেন্ট ব্যয় হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯.৩৬ সেন্ট। অর্থাৎ রূপপুরে উৎপাদন ব্যয় ভারতের কুদানকুলামের চেয়ে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
নির্মাণ ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র:
রূপপুর (বাংলাদেশ): কিলোওয়াট প্রতি নির্মাণ ব্যয় ৫,২৭৯ ডলার (মোট ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার)।
কুদানকুলাম (ভারত): কিলোওয়াট প্রতি নির্মাণ ব্যয় ৩,১২৫ ডলার।
তুরস্ক (আক্কুইউ কেন্দ্র): কিলোওয়াট প্রতি নির্মাণ ব্যয় ৩,২০০ ডলার।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, রূপপুর কেন্দ্রটি শুরু থেকেই দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ। আলোচিত ‘বালিশকাণ্ড’ থেকে শুরু করে বড় অংকের অর্থ পাচারের অভিযোগ এখন আলোচনায়। সর্বশেষ অনুসন্ধানে পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবার বিশেষ করে টিউলিপ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে, যা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। অভিযোগ রয়েছে, রুশ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রোসাটম শেখ হাসিনা পরিবারকে বড় অংকের অর্থ দিয়ে প্রকল্পের ব্যয় ১২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এই দুর্নীতির বোঝা এখন বর্তমান বিএনপি সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, "রূপপুর প্রকল্পের দুর্নীতির সাথে শেখ হাসিনা পরিবারের সংশ্লিষ্টতার খবর বিশ্ব গণমাধ্যমেও এসেছে। বর্তমান সরকারের উচিত এই প্রকল্প নিয়ে আরও অধিকতর অনুসন্ধান করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা।"
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল ২০২৬) রূপপুর কেন্দ্রের একটি ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হয়েছে, যার ফলে আগস্ট থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে পিডিবি এখনও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারেনি কারণ রোসাটম নির্মাণ ব্যয়ের স্বচ্ছ নথিপত্র প্রদান করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভিসা ও শ্রমবাজারের পরিবর্তনগুলো নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। মার্কিন দূতাবাস ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা নাগরিকত্বের উদ্দেশ্যে সন্তান জন্ম দিতে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে। বিপরীতে, রোমানিয়া সরকার অনিচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ হওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বৈধ হওয়ার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে।
১৯০৫ সালের সূচনালগ্ন থেকে বাঙালি জাতি যে অধিকারের লড়াই শুরু করেছিল, তার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনবান্ধব নীতি এবং কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদের স্মার্ট কৃষি পরিকল্পনা যেমন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে রূপপুর প্রকল্পের মতো মেগা দুর্নীতির বোঝা এবং প্রাক্তন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে রাশেদ খাঁনের ‘নৈতিক অপরাধের’ অভিযোগ ২০২৬-এর রাজনীতিকে এক নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, দুর্নীতির তদন্ত ও নীতিনির্ধারকদের স্বচ্ছতাই হবে আগামীর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: যুগান্তর, টিআইবি রিপোর্ট, স্প্রিঙ্গার রিসার্চ পেপার (ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামী), মার্কিন দূতাবাস ঢাকা ও বাংলাদেশ দূতাবাস (রোমানিয়া)।
বিশ্লেষণ: ১৯০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণের অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির কারণেই অনেক সরকারের পতন ঘটেছে। রূপপুর প্রকল্পের এই বিশাল ব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগ বর্তমান প্রশাসনের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা, যা সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না গেলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |