| বঙ্গাব্দ

সিচুয়েশন রুমের বৈঠক শেষ: ট্রাম্পের অনমনীয় শর্তে এখনও আটকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 30-05-2026 ইং
  • 7740 বার পঠিত
সিচুয়েশন রুমের বৈঠক শেষ: ট্রাম্পের অনমনীয় শর্তে এখনও আটকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি
ছবির ক্যাপশন: ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে শীর্ষ সহযোগীদের নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল বৈঠকটি শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নিয়ে কাটেনি চরম অনিশ্চয়তা। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে একটি ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নিতে শুক্রবার এই বিশেষ বৈঠকটি ডেকেছিলেন ট্রাম্প। তবে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও আলোচকদের তৈরি করা খসড়া প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কোনো নির্দিষ্ট সমঝোতা বা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বার্তা ছাড়াই তিনি বৈঠক ত্যাগ করায় শান্তিপ্রক্রিয়া আবারও ঝুলে গেল।

যদিও হোয়াইট হাউসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনও আশাবাদী এবং দাবি করছেন যে দু'পক্ষ একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তেহরানের পক্ষ থেকে চুক্তির প্রধান প্রধান শর্তগুলো নিয়ে তীব্র দ্বিমত পোষণ করা হয়েছে।

১. সিচুয়েশন রুমের বৈঠক ও ট্রাম্পের কড়া শর্ত

আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা এবং বড় ধরনের সংকট মোকাবিলার জন্য ব্যবহৃত হোয়াইট হাউসের সুরক্ষিত ‘সিচুয়েশন রুমে’ (Situation Room) শুক্রবার এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, "প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেবল এমন একটি চুক্তিই করবেন যা আমেরিকার জন্য ভালো এবং তাঁর বেঁধে দেওয়া ‘রেড লাইন’ বা শর্তগুলো পূরণ করে"

চুক্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মূল শর্তগুলো হলো:

  • পারমাণবিক অস্ত্রের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: ইরানকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তারা কোনো অবস্থাতেই কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।

  • হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটির উভয় দিকই অবাধ নৌযান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ খুলে দিতে হবে।

  • মাইন অপসারণ: যুদ্ধকালীন সময়ে হরমুজ প্রণালিতে পাতা সব সামুদ্রিক মাইন ইরানকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ ও ধ্বংস করতে হবে।

২. তেহরানের অনমনীয় অবস্থান ও দ্বিমতের ক্ষেত্রসমূহ

শান্তি আলোচনার টেবিলে ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই এবং তেহরানের নীতি-নির্ধারকদের অনমনীয় অবস্থান মূলত দেশের সার্বভৌমত্ব, সামরিক আত্মরক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং নিষেধাজ্ঞার মুখেও ইরান যেসব নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ, সেই দ্বিমতের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো
১. ইউরেনিয়াম মজুদের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব
  • অনমনীয় অবস্থান: ইরান তাদের উৎপাদিত ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে বা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে 
  • যুক্তির ক্ষেত্র: তেহরানের স্পষ্ট দাবি, এই পরমাণু প্রযুক্তি তাদের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক অর্জন এবং এর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে । আন্তর্জাতিক তদারকি (IAEA) মেনে নিলেও ইউরেনিয়ামের মালিকানা তারা নিজেদের কাছেই রাখবে।
২. হরমুজ প্রণালীতে টোল বা 'পরিষেবা ফি' আদায়
  • অনমনীয় অবস্থান: হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর একতরফা মার্কিন নিয়ন্ত্রণ ইরান কোনোভাবেই মেনে নেবে না 
  • যুক্তির ক্ষেত্র: ইরান ও ওমানের ভৌগোলিক জলসীমার ওপর ভিত্তি করে তেহরান দাবি করছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বজায় রাখার খরচ হিসেবে তারা প্রতিটি জাহাজ থেকে 'পরিষেবা ফি' বা টোল আদায় করবে। একে তারা তাদের জলসীমার আইনি অধিকার বলে মনে করে।
৩. 'আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার' করার পূর্বশর্ত
  • অনমনীয় অবস্থান: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে বা আংশিক প্রত্যাহারের যে প্রস্তাব ট্রাম্প দিয়েছেন, তা ইরান সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে
  • যুক্তির ক্ষেত্র: তেহরানের দ্বিমত হলো, যতক্ষণ না আমেরিকা সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ তুলে নিচ্ছে এবং বিদেশে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করছে, ততক্ষণ তারা মূল চুক্তিতে সই করবে না । তারা মৌখিক আশ্বাসে বিশ্বাসী নয়।
৪. ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অস্বীকৃতি
  • অনমনীয় অবস্থান: ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন প্রযুক্তির ওপর কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপের শর্ত তেহরান আলোচনার এজেন্ডা হিসেবেই রাখতে চায় না 
  • যুক্তির ক্ষেত্র: ইরানের সামরিক কমান্ডের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটির বিপরীতে এই মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমই তাদের একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধক (Deterrent) [১.২.২]। এটি নিয়ে আলোচনা করাকে তারা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস বলে মনে করে।
৫. আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক রক্ষা
  • অনমনীয় অবস্থান: মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ অক্ষ বা 'অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স' (যেমন হিজবুল্লাহ, হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়া)-কে দেওয়া রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন বন্ধ করার মার্কিন দাবি ইরান নাকচ করে দিয়েছে
  • যুক্তির ক্ষেত্র: তেহরানের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সুরক্ষাকবচ এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ইরানের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির অংশ, যা কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির শর্ত হতে পারে না

চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চললেও তেহরানের এই পাঁচটি অনমনীয় দেয়াল ভাঙা বর্তমান শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ 

৩. সংঘাতের পটভূমি: কীভাবে বন্ধ হয়েছিল হরমুজ প্রণালি?

এই তীব্র সামরিক সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৬ সালের শুরুতেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়।

এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এই সংঘাতের অংশ হিসেবে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ফলস্বরূপ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়। যদিও পরবর্তীতে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পাল্টা অভিযোগ তুলেছে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিচুয়েশন রুমের বৈঠক থেকে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া বের হয়ে যাওয়া আসলে তাঁর চিরপরিচিত ‘আর্ট অফ দ্য ডিল’ (Art of the Deal) কৌশলেরই অংশ। তিনি খসড়া প্রস্তাবে অনুমোদন না দিয়ে ইরানকে এই বার্তাই দিতে চাইলেন যে, ওয়াশিংটন কোনো তাড়াহুড়ো করছে না এবং মার্কিন শর্তে পুরোপুরি রাজি না হলে তারা অর্থনৈতিক অবরোধ বা প্রয়োজনে পুনরায় সামরিক অ্যাকশনে যেতেও দ্বিধা করবে না। অন্যদিকে, ইরান ভালো করেই জানে যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং তেলের চড়া দাম বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কতটা ক্ষতিকর। তাই ১,২০০ কোটি ডলারের জব্দ সম্পদ উদ্ধার এবং নিজেদের পারমাণবিক সম্মান বজায় না রেখে তারা ট্রাম্পের একতরফা চুক্তিতে সই করবে না। এই মুহূর্তে শান্তিচুক্তিটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অচলাবস্থায় রয়েছে, যেখানে দুই পক্ষই একে অপরকে ‘ব্লিঙ্ক’ করানোর চেষ্টা করছে।

অনুমোদিত লেখক: BDS Bulbul Ahmed

ডিজিটাল গ্রোথ, এসইও স্ট্র্যাটেজি এবং আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস দেখতে ভিজিট করুন:বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency